৩১ মে ২০২৫
আমি ভোর ছয়টার
আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়ি। সকালে উঠে ফজরের নামাজ পড়ে নিলাম ,নেপালে আসার পর থেকে বেশিরভাগ
ওয়াক্তই কাযা করতে হচ্ছিল। কিছু করার ছিল না ।সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট না করেই রওনা দিলাম
।
| গৌরিশংকরের সামনে মারদি হিমাল ট্রেকের উদ্দেশ্যে |
জীপে করে রওনা
হওয়ার আগে পাশের মানি এক্সচেজে ৫০ ডলার ভাঙিয়ে নিয়েছিলাম। সে মুহূর্তে ওই মানি এক্সচেঞ্জে
কর্মরত মহিলার আচরণ আমাকে মুগ্ধ করেছিল ।বলেছিলাম ১০০ ডলারের নোট দিয়ে ৫০ ডলার চেঞ্জ
করে দিতে , বাকিটা এনপিআর এক্সচেঞ্জ করে দিতে। উনি বলার সাথে সাথে ভোঁ-দৌড় দিয়ে উনাদের
লকার থেকে আমার জন্য ডলার চেঞ্জ করে এনে দিল। আমি বলছিলাম আমার হাতে পর্যাপ্ত সময় নেই ।
![]() |
| গাড়ি চলে না ! |
খুব ভালো একটা ইমপ্রেশন নিয়ে রওনা হলাম পিতাম দেউড়ালির
উদ্দেশ্যে । জীপের পাশের জানালা দিয়ে পাহাড়ি দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। এটা বান্দরবানের
রাস্তার পাশের দৃশ্যের মতো অনেকটা ।রাস্তার পাশের মানুষগুলো দেখলাম জ্যাকেট পরে আছে
,তাপমাত্রা মোটামুটি ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর কাছাকাছি। তারপরেও ওদের পরনে জ্যাকেট ফুল
প্যান্ট দেখে অবাক হলাম ।সরু রাস্তা দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে গাড়ি উঁচু রাস্তায় উঠছিল
।জানালার পাশ দিয়ে সবুজ পাহাড় দেখা যাচ্ছে । এখন অবধি বরফ আবৃত পাহাড় চূড়ার দেখা
মেলেনি ; বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের মতই পাহাড়গুলো, কিন্তু উচ্চতা একটু বেশি।
আমরা গিয়েছি বর্ষা মৌসুমে ,রাস্তা পুরো কর্দমাক্ত। অনেক পাথর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা। অর্ধেক রাস্তা পেরোনোর
পরে গাড়ির ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায় ।সাথে সাথে ওই গাড়ির সাথে আমাদের যাত্রার ওখানেই
সমাপ্তি।
![]() |
| পিতাম দেউড়ালিতে ভূড়িভোজ(!) শেষে |
তখনো পিতাম
দেউড়ালি থেকে আমাদের অর্ধেকের বেশি রাস্তা বাকি । আমরা দিগভ্রান্তের মতন দাঁড়িয়ে
আছি রাস্তায়। ট্রেকিং শুরু হতে না হতেই এমন অবস্থার মুখোমুখি হতে হলো।হুট করে আজমাইন
চেঁচিয়ে উঠল ওর জুতো দিয়ে জোঁক উঠছে ।এটা শুনে আফ্রিদি মাইশা দুজনই বলতে লাগলো ওদের
পায়ের নিচের দিকে কিছুটা চুলকানি বোধ করছে ।বলতে বলতেই দেখে জোঁক ওদের পায়ে বসে আছে
,আর বেশ অনেকক্ষণ ধরেই আছে ।আমি বাসা থেকে লবণ নিয়ে এসেছিলাম ।লবণের বক্সটা বের করে
আমি পায়ে হাতে লবণ মাখলাম ,বাকিরাও নিল । সাথে লীচ সক(leech sock) পরে নিলাম।
সবাই হঠাৎ করে দেখি রিহা আজমাইন চিৎকার করছে । হাত
থেকে কিছু একটা পড়ে গেছে। শুরুতে ভেবেছিলাম মোবাইল ফোন, তারপর দেখি আজমাইনের পাসপোর্ট
।উপর থেকে পাহাড়ি সরু ঝর্ণার পানি রাস্তার পাশ দিয়ে আড়াআড়ি ভাবে নিচের দিকে গেছে।
ওখানে রাস্তার পাশে ওরা দাঁড়িয়েছিল। নিচের দিকে আজমাইন ঝুঁকতেই ফ্যানি প্যাক থেকে
পাসপোর্ট নিচে পড়ে যায়। সাথে সাথে ও কিছুক্ষণের জন্য একদম স্তম্ভিত হয়ে থাকে। আমরা
কয়েকজন দৌড়ে রাস্তার অপর পাশে গিয়ে দেখি এটা ওখানে একটা ছোট ডালের গোড়ার দিকে
কোন মতনে আটকে আছে । স্রোতের তোড়ে একদম ভেসে যাবে যাবে অবস্থা ।গাড়ির ড্রাইভারকে আমরা
চিৎকার করে সাহায্য করতে বলতে থাকলাম ।সম্ভবত উপরওয়ালা চেয়েছিলেন আমাদেরকে সহজে এ
যাত্রায় বাঁচিয়ে দিবেন- সেজন্যই গাড়ির ড্রাইভার মামার সাহায্য নিয়ে পাসপোর্ট উদ্ধার
করা সম্ভব হলো । অন্যথায় এ মুহূর্তটা পুরো ট্যুরের ট্র্যাজিক মোমেন্ট হয়ে থাকতো যেখানে
“শুরুর কথা বলার আগেই শেষ “
আমরা যে এলাকায়
আটকে আছি সেখানে আমার Ncell মোবাইল অপারেটরের কোন নেটওয়ার্ক নেই ।নাভিদের Ntel সিমে
নেটওয়ার্ক পাওয়া গেল । সাঞ্জু ভাই আমাদের
টুরগাইড ,ভালো পরিপাটি অমায়িক মানুষ । শুরু থেকেই আমাদের হেল্প করে যাচ্ছেন ।উনার সাথে
আজমাইন ফোনে কথা বলে আরেকটি গাড়ি ঠিক করল ।সেই গাড়িতে ব্যাগ পোটলা উঠিয়ে আমরা রওনা দিলাম আবারও পিতাম দেউড়ালির উদ্দেশ্যে
।
সকালে আমরা
কেউ ব্রেকফাস্ট করে বের হইনি ।আর দুপুরে বা বিকালের মাঝে ফরেস্ট ক্যাম্প পৌঁছে যাব
ভেবে আমি ব্রেকফাস্ট অর্ডারও করিনি । প্রায় এক দেড় ঘণ্টার জার্নি শেষে আমরা পৌঁছলাম
পিতাম দেউড়ালি। চারদিকে তখন মেঘ দেখা যাচ্ছে।তাপমাত্রা এখন পোখারা থেকে বেশ অনেকখানি
কম ।ঠান্ডা বাতাসের তীব্রতা বেড়ে গেছে ।বাকি কয়েকজন ম্যাশড পটেটো অর্ডার দিয়েছিল
।আমরা যারা অর্ডার করিনি তারা কিছুটা শেয়ার করে খেয়ে নিলাম ।যতটুকু সোজা ট্রেকিং
কে ভেবেছিলাম তার থেকে বেশ কয়েকগুণ কঠিন হবে আন্দাজ করতে পারলাম ।
![]() |
| ট্রেক অফিসিয়ালি শুরু |
আবারো খাওয়া-দাওয়া
পর্ব শেষ করে আমাদের গন্তব্য ফরেস্ট ক্যাম্পের দিকে রওনা হলাম ।আমাদের সাথে এখন নতুন
সঙ্গী গাইড প্রাজ্জাল ভাই ।সামনে একদম ট্রেকের শেষ দিন অবধি থাকবেন আমাদের সাথে । ট্রেকিং শুরু করলাম ফরেস্ট ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে । এখন
শুরু থেকেই অক্সিজেনের স্বল্পতা অনুভব করতে পারছিলাম ।উচ্চতা ২১০০ মিটার । বলা বাহুল্য
বাংলাদেশের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গড় উচ্চতা গড়ে প্রায় টেনে টুনে ৮ মিটারের কাছাকাছি
আর সর্বোচ্চ উচ্চতার পাহাড় তাজিনডং এর উচ্চতা ১২৮০ মিটার । কিছুক্ষণ প্রায় দশ মিনিটের
মতো যেতে না যেতেই সবার পানি খাওয়া লাগলো। প্রাজ্জাল ভাই সবাইকে ডি হাইড্রেট না হওয়ার
জন্য পরামর্শ দিলেন । সাথে উনাকে ‘দাঈ’ ডাকার জন্য বললেন। নেপালি ভাষায় বড় ভাইকে
‘দাঈ’ ডাকা হয়। যাই হোক , আমরা আবারো যাত্রা শুরু করলাম ফরেস্ট ক্যাম্পের দিকে। আমার ন্যাচারাল পেইস একটু বেশি ।সবকিছুতে তোড়জোড়
বেশি করি যেটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খারাপ, ট্রেকিংয়ের জন্য আরো খারাপ । মোটামুটি পুরো
ট্রেক জুড়ে আমি ,নাভিদ , প্রমি ,তাজওয়ার এগিয়ে ছিলাম যেটাকে আমরা নাম দেই এজেপি গ্রুপ
(এগিয়ে যাওয়া পাবলিক)। মাঝে মাঝে আফ্রিদির আবির্ভাব ঘটতো এই গ্রুপে অবশ্য। ঘন্টাখানেক চলা- থামা- চলা এমন করে সামনে এগোতে থাকলাম ।
![]() |
| ট্রেকিং পর্ব -১ |
মারদি হিমাল
ট্রেকের একটা নির্ধারিত সাইন আছে- সাদা -নীল পতাকার মতন। আর্জেন্টিনার পতাকা অনেকটা,
মাঝে কেবল সূর্য টা নেই ।নেপালি কয়েকজন ও ট্রেকিং করছিল আমাদের সাথে ।ওদের থেকে বিষয়টা
জানলাম । এটা জানার পর থেকে হাঁটার গতি অনেক বেড়ে গেল । যেহেতু এখন আর দাঈ প্রাজ্জালের
সাহায্য লাগছে না ,আমি আর নাভিদ অনেকখানি সামনে এগিয়ে গেলাম । পেছনে অনেকক্ষণ ধরেই
কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না । অনেকখানি উপরে ওঠার পর পানি শেষ হয়ে গেল ।একটা অস্থায়ী
হোটেলে কিছুক্ষন বিশ্রাম নিচ্ছিলাম ।পানি ভরতে চাইলাম। হোটেলের লোকটা সম্ভবত নেশাগ্রস্ত
ছিল , ঝুলতে ঝুলতে ১০০ রুপি চাইল পানি ভরার জন্য । আমি ৫০ রুপি দিয়ে সামনে চলতে শুরু
করলাম ।
![]() |
| ট্রেকিং পর্ব-২ |
কিছুক্ষণ যাওয়ার
পর দুটো রাস্তার ইন্টার সেকশন পড়লো। আমরা (আমি
আর নাভিদ) ট্র্যাকের সাইন ধরে ডান দিকে গেলাম , কিন্তু কিছু রাস্তা যাওয়ার পর আর নীল
সাদা সাইন পাচ্ছিলাম না । শুধু লাল -হলুদ পতাকা কিছুদূর পরে পরে । আমি আবারও পিছে অনেক
দূর দৌড়ে একটা হোটেলে জিজ্ঞেস করে আসলাম ঠিক রাস্তায় আছি কি না -ওরা বলল রাস্তা ঠিকই
ছিল, এখানে পতাকা গুলো ম্যারাথন প্রতিযোগিতার সময় লাগানো হয়েছিল । হতাশ হয়ে আবারো
আগের জায়গায় ফিরে আসলাম আর হাঁটতে শুরু করলাম। গতি অনেকখানি বাড়ালাম। সামনে এক জায়গায়
হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে জোরে চিৎকার দিয়ে উঠেছিলাম। ভাবলাম পা মচকে এখানেই বুঝি সব
শেষ । সৌভাগ্য ক্রমে কোন সমস্যা হয়নি কিছুক্ষণ খোঁড়ানো বাদ দিলে ।
![]() |
| ট্রেকিং পর্ব-৩ |
![]() |
| ট্রেকিং পর্ব-৪ |
সন্ধ্যা ঘনিয়ে
আসছিল। সন্ধ্যার ছয়টার আশেপাশের সময় তখন, বাংলাদেশ সময় থেকে নেপালের সময় 15 মিনিট
পেছানো। চারপাশ থেকে থেকে হুট করে ঘন্টার আওয়াজ পাওয়া গেল ।গরুর পাল একযোগে মালিকের
বাড়ি ফিরছিল, পাশে দিয়ে আমাদের কে দুটো কুকুর অনুসরণ করছিল। শেষমেষ ট্রেকের শেষ দিন
পর্যন্ত এ দুটো কুকুর আমাদের সাথে সাথে গিয়েছে ,এটা একদমই বিচিত্র অভিজ্ঞতা ।যখন কিছুদূর
সামনে গিয়ে দেখলাম “ওয়েলকাম টু ফরেস্ট ক্যাম্প “ তখন মনের আনন্দে আচমকাই চিৎকার
করে উঠলাম ।
![]() |
| বহুল প্রতীক্ষিত ফরেস্ট ক্যাম্প ! |
ফরেস্ট ক্যাম্পে
পৌঁছানোর সাথে সাথে তুমুল বৃষ্টি শুরু হল। সাথে সাথে অন্ধকারও নেমে আসলো। তবে বিস্ময়কর
ভাবে বৃষ্টির ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর সোনালী লাল আভায় পুরো দিগন্ত বিস্তীর্ণ হয়ে
গেল ।এটা ট্রেকের অসম্ভব সুন্দর দৃশ্যগুলোর মাঝে একটি ।আমি আর নাভিদ অন্য আরেকটা রেস্টুরেন্টে
নাস্তা করে নিলাম ।পাশে বিদেশি এক কাপলের সাথে দেখা হল যাদেরকে সেই পোখারা থেকেই
টাইম টু টাইম দেখে আসছি। ভদ্রলোকের ইংলিশ একসেন্ট শুনে আমি বুঝতে পারলাম উনারা ইটালিয়ান
কাপল। উনি আমার আন্দাজ শুনে বিস্মিত হয়ে গেলেন। হা হা !
![]() |
| বৃষ্টি শেষে হিমালয়ের সোনালি রোদ্দুর,ফরেস্ট ক্যাম্প থেকে তোলা! |
![]() |
| ফরেস্ট ক্যাম্পের আকাশে লক্ষ তারা |
ফরেস্ট ক্যাম্পের তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের
আশেপাশে ,উচ্চতা ছিল ২৫৫০ মিটারের কাছাকাছি। আমাদের মতন বাঙ্গালীদের জন্য যা একেবারেই
অনভিপ্রেত। চিমনির পাশে বসে বাকিরা ডিনার করল। ফরেস্ট ক্যাম্পের হোটেল মালিকের ব্যবহার
তেমন সুবিধার লাগল না ।ফরেস্ট ক্যাম্পের ওয়াশরুম মোটামুটি ভালই, হিটারের ব্যবস্থা
ছিল যদিও টাকার বিনিময়ে ।রাতে বৃষ্টি শেষে আকাশ একদম পরিষ্কার ,অনেক বেশি নক্ষত্র রাজি
দেখা যাচ্ছে যেটা বাংলাদেশের অপরিষ্কার আকাশে একেবারেই দূরূহ একটা ব্যাপার। মাঝের উঠানে
আমরা গ্রহতারার ছবি তুলে কিছুক্ষণ গল্প গুজব করে রাতে ঘুমাতে গেলাম। হিমালয়ের কাছকাছি
দৃশ্যমান সমতলে এটাই আমাদের প্রথম রাত্রিযাপন। পরের দিনের গন্তব্য মারদি হিমাল হাই
ক্যাম্প।










No comments:
Post a Comment