Friday, June 6, 2025

সপ্তম দিন ( গন্তব্য বাংলাদেশ )

 

০৪ জুন ২০২৫

সকাল ছয়টার দিকে ঘুম থেকে উঠে যাই। আমি, প্রমি আর নাভিদ বেরিয়ে পড়ি থামেল কাঠমান্ডুর রাস্তায়। সকালে তেমন কোন খাবারের দোকান না পাওয়ায় শপিং করতে থাকি। আমি হ্যাট,ব্যাগ, শাল আর স্যুভিনিয়ার হিসেবে এভারেস্ট ফ্রিজ ম্যাগনেট কিনি। বাকিরা আরো বেশ কিছু জিনিস কিনে যেমন খুকুরি। নেপালে ছুরি চাকু টাইপ জিনিসের রেপ্লিকাকে খুকুরি বলে। মানুষ শো পিস হিসেবে ব্যবহার করে।  আমি ওদের সাথে ঘুরতে থাকি কেনাকাটা শেষে। প্ল্যান ছিল কিছু হিস্টোরিক প্লেস দেখার কিন্তু সময় কুলালো না।

কাঠমান্ডু নামা

থামেল মার্কেট


কাঠমান্ডু নেপালের রাজধানী অথচ দেখে মনে হয় বাংলাদেশের ছোটখাটো একটা মফস্বল। খুবই ছিমছাম পরিপাটি সুন্দর শহর ।অতিরিক্ত কোন আড়ম্বরতা নেই। বিল্ডিং গুলো ঢাকার মতন বহুতল বিশিষ্ট না। দুই তিন তলা বিল্ডিং ,কিন্তু শৈল্পিক সৌন্দর্য স্পষ্ট ।আশপাশের কোন শব্দদূষণ নেই ,ময়লা আবর্জনা নেই। দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। কেনাকাটা শেষে থামেলের সেই মুহাম্মাদ্স কিচেনে কোথে মোমো খেলাম ব্রেকফাস্ট হিসেবে ।ব্রেকফাস্ট শেষে চকলেট ফ্লেভার এর বোবা টি খেলাম ৩০০ নেপালি রুপিতে। বেশ সন্তোষজনক মনে হলো দাম হিসেবে । দোকানে একজন দুবাই এর বাঙালির সাথে দেখা হলো। আমাদের সাথে বেশ অনেক ক্ষণ কথা বললেন। আমাদের থেকে এক বছর সিনিয়র। পড়ালেখা শেষ করার আগেই দুবাই পাড়ি জমে জমিয়েছেন। উনার বাড়ি কুমিল্লায়। আজকে আমাদের সাথে একই ফ্লাইটে ঢাকা যাবে। উনার নাম টা পুরোপুরি মনে পড়ছে না।সম্ভবত ইমরান নাম ছিল।উনার সাথে আমরা কিছুক্ষণ গল্প গুজব করলাম। তা শেষে মানি এক্সচেঞ্জে এনপিআর থেকে ডলারে ভাঙিয়ে আমরা এন্টিক হোস্টেলে ব্যাক করলাম ।বেলা সাড়ে বারোটার দিকে হোস্টেল থেকে পাঠাও নিয়ে ত্রিভুবন এয়ারপোর্টে প্রবেশ করি।


থামেল মার্কেট লাস্ট স্ন্যাপ!



এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশনে ঢোকার পরে একটা অদ্ভুত হাস্যকর ঘটনা ঘটে।রিহা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিল। তা দেখে এয়ারপোর্টের লোকজন মনে করেছিল পাশের Disabled Persons দের জন্য ইমিগ্রেশন ওদের জন্য!

বিকাল  চারটার দিকে। একদম ঠিকঠাক সময়ে প্লেন টেক অফ করলো । জানালা দিয়ে মাউন্ট এভারেস্ট দেখা যাচ্ছে। খন্ড খন্ড মেঘের ভেতর দিয়ে আর অবারিত সুন্দর মুহূর্ত নিয়ে আমরা বিকাল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ ঢাকার হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে ল্যান্ড করলাম। ইমরান ভাই আমাদের চকোলেট উপহার দিল বোর্ডিং এর দিকে যাওয়ার সময়। পর্দা নামলো আমাদের জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি পর্বের।

 

দূরে মাউন্ট এভারেস্ট দেখা যায়!

জীবন সংক্ষিপ্ত ,পৃথিবী অনেক বড় । স্রষ্টা পৃথিবীকে সাজিয়েছেন তাঁর অপার কৃপায় ,অসাধারণ নৈপুণ্যে। জীবন থেমে থাকে না, এগোতে এগোতে একসময় পাড়ি দেয় অসীমের গন্তব্যে । জীবনে চলার পথের অসম্পূর্ণ আশা-আকাঙ্ক্ষা গুলোকে অপূর্ণ রাখা উচিত নয়- এই নেপাল ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় বারংবার এটাই মনে হয়েছে ।হয়তো জীবনে আরো অনেক কিছুর সুযোগ আসবে, প্রতিটি সুযোগের সদ্ব্যবহার করলে অন্তত জীবনের একটা পর্যায়ে গিয়ে হয়তো আফসোস কম থাকবে।সবশেষে এটাই …

                                                           “Sayonara Nepal

                                                     You will be remembered”



ষষ্ঠ দিন ( কাঠমান্ডু ফেরা )

 

৩ জুন ২০২৫

আমি ভোর ছয়টার মাঝে উঠে গেলাম। ফোন চার্জ দিয়ে ব্রেকফাস্টের জন্য রেডি হলাম। সবাই আজকে বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে ।ভালো ঘুম হয়েছে সবার।আফ্রিদি তার ‘মাচুপিচু’র ছবি নিয়ে আবার রিলস বানাতে ব্যতিব্যস্ত। ব্রেকফাস্ট শেষে সবাই যার যার ব্যাগ গোছাল। ব্যাগ গুছিয়ে আমরা রওনা হলাম লো ক্যাম্প এর উদ্দেশ্যে ।

অন্নপূর্ণার শেষ দর্শন


উপরে উঠার সময় লো ক্যাম্পে মাইশা রয়ে গেছিল। আর উপরে উঠেনি ,রয়ে গেছে সেখানে। লো ক্যাম্পে পৌঁছাতে ঘন্টা দু-এক লাগলো ।লোক্যাম্পে যাওয়ার মুহূর্তে শেষবারের মতোন অন্নপূর্ণার ভিউ দেখতে পেলাম l লো ক্যাম্পে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে  আমরা  আবার রওনা দিলাম সিধিং ভিলেজ এর উদ্দেশ্যে ।

লো ক্যাম্পে ফেরার পথে


লোক্যাম্প থেকে সিধিং ভিলেজ এর দূরত্ব তিন ঘন্টার মতোন। অনেক বেশি সিঁড়ি নির্ভর ট্রেক এটা ।এখন বুঝতে পারছি কেন মানুষ উপরে ওঠার সময় সিধিং ভিলেজ হয়ে না উঠে ফরেস্ট ক্যাম্প দিয়ে উঠে। ঢাল দিয়ে ওঠা ঢের সহজ সিঁড়ির থেকে। লোক্যাম্প থেকে সিধিং ভিলেজের রাস্তা জুড়েই শুধু বড় বড় সিঁড়ি। সিঁড়ি যেন শেষই হয় না ।ঘন্টা দুয়েক পরে একটা রেস্ট স্পটে থামলাম। ওখানে এক ব্রিটিশ কাপল বিশ্রাম নিচ্ছিল, সাথে মোটামুটি বয়স্ক ভদ্রলোক বসে আছে ।আমার পাশে এসে বসতেই আমি গ্রিটিংস দিয়ে ক্যাজুয়াল কথাবার্তা বলতে লাগলাম। ভদ্রলোক নেপালের ব্রিটিশ হাই কমিশনে কর্মরত। আমাকে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। কথা বলতে বলতে সেই দুইজন পোর্টার আমাদের জন্য বড় পাত্রে করে খুরপানি ফল নিয়ে আসলো ।উল্লেখ্য , পুরো ট্যুর জুড়েই আমাদের সাথে এই দুইজন পোর্টার তিনটে ব্যাগ বহন করে নিয়ে আসছে। নেপালের বেশ জনপ্রিয় ফল খুরপানি। তবে শহরে নাকি খুব বেশি পাওয়া যায় না। খুরপানি বা অ্যাপ্রিকটের চামড়াটা হালকা টক, তবে ভেতরের অংশ বেশ মিষ্টি। উপর থেকে নিচে আসার সময় আমরা যে পরিমাণ শ্রান্ত পরিশ্রান্ত ছিলাম একটা খুরপানি খেয়ে মনে হচ্ছিল যেন স্বর্গীয় ফল খাচ্ছি। ফল পানি খেয়ে আমরা রওনা হলাম আবারও সিধিং ভিলেজের উদ্দেশ্যে ।

খুরপানি ফল






ট্রেকিং এর রেস্ট স্পটে বসে ডাইরি লেখছিলাম। 
Candid capture by Azmine

সিধিং ভিলেজ এখান থেকে আরও এক দেড় ঘন্টার রাস্তা ।রাস্তায় পাথর ছড়ানো ,পায়ে বেশ বাজেভাবে লাগছিল ।অনেক দূরে বেশ কতগুলো ট্যাক্সি দাঁড়ানো দেখলাম।  মুহূর্তের মাঝে পায়ের গতি বেড়ে গেল ।শরীরকে অনেকটা অভিকর্ষের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিচে নামতে লাগলাম ।দূর থেকে দেখতে পেলাম দাঈ ইশারা করছে সবুজ টেমপ্লেটওয়ালা জীপে উঠে বসতে। ধীরে ধীরে সবাই পৌঁছালো। রিহা পৌঁছানোর ঠিক দুই মিনিট আগের রাস্তায় দুইবার ধপাস করে সবার সামনে পড়ে গিয়েছিল ।বাকিরা বেশ “সহিহ সালামতে” ই গাড়িতে উঠে বসলো । সিধিং ভিলেজ থেকে স্কোরপিওতে করে পোখারার দিকে রওনা হলাম ।দাঈ প্রাজ্জাল ওই সিধিং ভিলেজ স্টেশন থেকে আমাদেরকে বিদায় জানালো ।


ট্রেকিং শেষ!

অনেকদিন পরে সমতল ভূমিতে এসে নিজেদের এলিয়েন মনে হতে থাকলো ।দুই ঘন্টার মাঝে পোখারায় গৌরীশংকর ব্যাকপ্যাকার্সে পৌঁছলাম। গৌরীশংকর হোস্টেল লকার থেকে লাগেজ বের করে লবিতে আমরা ফ্রেশ হচ্ছিলাম ।সাথে সাথে আবিরের টেক্সট- সৌম্যদা মারা গেছেন ,লাশ কানাডার লেক থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। সারা শরীর বরফের মতন ঠান্ডা হয়ে গেল । নিজেকে আপাতত কোন মতন সামলে রাখলাম ।হোটেলে লাগেজ গুছিয়ে নিয়ে লাঞ্চের জন্য গেলাম আবারো লাযিয রেস্টুরেন্টে ।

Phewa Lake


আমাদের বাঙালিদের স্বল্প দূরত্বে রিকশায় চড়ার অভ্যাস। নেপালে গিয়ে রিকশা কে খুব বেশি মিস করছিলাম। পোখারায় বলতে গেলে একেবারেই রিকশা নেই।এখানে হেঁটে চলেই মানুষ রাস্তায় পায়চারি করে। শহরটাও বেশ ছোট।পাড়ার রাস্তার মতোন মনে হয়।আর একটু বেশি দূরত্বের জন্য স্কুটি বা বাইক ভাড়া করে৷  কাঠমান্ডুতে কিছু রিকশা আছে হাতেগোনা,তাও ভাড়া অনেক বেশি চায়। যাই হোক, পুরা নেপালে আমার জন্য রিকশা ভ্রমণ অভিজ্ঞতা শূন্যই রয়ে গেছে। 


লাযিযে স্পাইসি চিকেন আর গার্লিক নান অর্ডার করলাম ।হালাল রেস্টুরেন্ট অনেকদিন পর পাওয়ায় সবাই চেটেপুটে খেল চিকেন আইটেম টা। খাওয়া-দাওয়া শেষে মাইশা বিদায় নিল আমাদের থেকে ।ও আরো তিন দিন পর বাংলাদেশে ফিরবে আর আমরা বাকি ৭ জন Phewa Lake  গেলাম সময় কাটাতে। Phewa Lake তেমন আহামরি মনে হয়নি ,বাংলাদেশের কাপ্তাই লেকের শর্ট ভার্সন। আমরা না গিয়ে নিজেদের মতন সাইডওয়াকে হাঁটাহাঁটি করতে লাগলাম। তাজওয়ার ,নাভিদ লেকের পাশে বসে ছিল। আমি ,প্রমি ,আফ্রিদি একটু দূরের জোরবা রেস্টুরেন্টে কফি খেতে গেলাম । বরাবরের মতোই বিস্বাদ কফি। নেপাল থেকে বাংলাদেশ অন্তত খাবারদাবারের রুচিতে মাইল খানেক  এগিয়ে। সবশেষে আমরা ব্যাক করলাম আমাদের ব্যাক প্যাকার্স  হোস্টেলে ।গাইড সঞ্জু ভাই আমাদের জন্য বড় সাইজের স্কোরপিও জীপ নিয়ে এসেছে। উনার সাথে সরাসরি আমার এই প্রথম দেখা ।উনার সাথে সবাই থাম্ব আপ সেলফি তুলে রওনা দিলাম কাঠমান্ডুর উদ্দেশ্যে। এবারের মতো এখানেই শেষ দর্শন  ছবির মত সুন্দর শহর পোখারার।


হোটেল জোরবা ক্যাফে




গাড়ির ড্রাইভার অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে যাচ্ছিল । এমনকি পাহাড়ি বাঁকে একদম লো ব্যাংকিং এও অনেক দ্রুত গতিতে পার হচ্ছিল । পিছনে বসে এই গতি দেখে ভালোই ভয় কাজ করছিল । ঘণ্টা দু এক পরে রাস্তার পাশে হালাল একটা রেস্টুরেন্টে সবাই ডিনার ব্রেক নিলাম ।ডিনারে ব্রেড ডিম মামলেট খেলাম আমি আর আজমাইন ,আর বাকিরা ডাল ভাত খেলো ।সবাই খুবই সন্তুষ্ট খাবার নিয়ে ।তবে খাবার শেষে ব্যানানা লাচ্ছি খেয়ে মুখের স্বাদ নষ্ট করলাম।

আবারও সবাই গাড়িতে চড়ে বসলাম ।গাড়িতে ড্রাইভার স্পিকারে বেসুরো গান বাজাচ্ছে যাতে উনি না ঘুমিয়ে যায় ।আমাদের ঘুমাতে সমস্যা হচ্ছে ,তাও সবাই ঘুমাচ্ছি মরার মত ।বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে ।ঘুমাতে ঘুমাতে রাত দুইটা নাগাদ আমরা উঠি কাঠমান্ডুর অ্যান্টিক হোস্টেলের ডর্মিটরিতে। কবুতরের খোপের মতন কিউট ডর্ম। আর শোয়ার পাশেই চার্জিং সকেট আর ফ্যানের সুইচ ।এমন ‘বিলাসবহুল’ থাকার জায়গা পেয়ে সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়ি





পঞ্চম দিন (মারদি হিমাল ট্রেক : গন্তব্য বেজ ক্যাম্প)

 ২ জুন ২০২৫

ভোর সাড়ে তিনটায় আমাদের বেজ ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করার কথা। ভোর ৩.১৫ এর দিকে প্রমির গলার আওয়াজ এ ঘুম ভাঙ্গে । সবার জন্য দাঈ দুটো করে সেদ্ধ ডিম  নিয়ে এসেছে । প্রমি দিতে এসে দেখে সবাই ঘুমে । আমার ঘুম বেশ কাঁচা ,সামান্য শব্দ শুনে উঠে পড়েছিলাম ।সাথে আফ্রিদিও হন্তদন্ত হয়ে উঠে খাবারটা নিতে যায়,যদিও প্রমি দরজার হাতলে খাবার রেখে দিয়ে আবারো রুমে চলে যায় ।

ভোর ৪ টার দিকে অপারেশন সার্চলাইট গোয়েন্দা বাহিনী


আমার মাথা ব্যথা এখনো রয়ে গেছে। মাথা চোখের ব্যথায় তখনও বেশ বাজে অবস্থা ।তাপমাত্রা মনে হচ্ছিল হিমাঙ্কে নেমে গেছে। আমারও টিথ চ্যাটারিং শুরু হয়েছিল ,থামাতেই পারছিলাম না । কপালে হেডলাইট বেঁধে হাতে গ্লাভস জড়িয়ে যাত্রা শুরু করলাম বেজ ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে । পাঁচ মিনিটের মাথায় সবার মনে পড়ল ডিমের প্যাকেট নিয়ে আসা হয়নি । আমি দৌড়ে প্যাকেট  আনতে গেলাম । পরে দেখি রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি । অন্ধকারে জোরে চিৎকার করতে লাগলাম “ আই হ্যাভ লস্ট মাই ওয়ে, ইজ এনি বডি হেয়ার ?” আমার চিৎকার শুনে দাঈ পেছনে ব্যাক করল আমাকে সাহায্য করতে।  আমি চিৎকার করে আফ্রিদি আর তাজওয়ারকে বললাম ডিমের প্যাকেট নিয়ে আসতে। ওরা প্যাকেটটা নিয়ে আসলে আমার ব্যাক প্যাকে নিয়ে নিলাম।



ডিম পর্ব


ইতালিয়ান কাপল দের সাথে বেজ ক্যাম্পের পথে


আমি তারপরে ফাস্ট পেইসে হাঁটা দিয়ে রিহা প্রমি আজমাইন কে ধরতে পারলাম ।নাভিদ অনেকটা সামনে চলে গেছে ততক্ষণে ।কপালে হেডলাইট ,হাতে ট্রেকিং পোল, কাঁধে ব্যাকপ্যাক- একদম পুরোপুরি অ্যাডভেঞ্চারের ফিলিং আসছিল ।পথিমধ্যে একটা খেজুর খেয়ে একটু রেস্ট নিয়ে আবারো হাঁটা শুরু করি। এখন ট্রেকের এলিভেশন অনেক বেশি । সিঁড়ির পরিমাণও অনেক বেড়ে গেছে ,হাইপক্সিয়া আগের থেকে অনেক বেশি পরিমাণে হচ্ছিল। মাথাব্যথা একটু কমেছে হাঁটতে হাঁটতে। আজকে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি শক্তি প্রয়োগ করতে হচ্ছে উপরে ওঠার জন্য ।

বেজ ক্যাম্পের পথে ,পর্ব-২


উঠতে উঠতে মাঝে  চারণভূমি চোখে পড়ল । অনেকগুলো চমড়ি গাই ঘুরে বেড়াচ্ছিল। দাঈ বলল ওদেরকে বিরক্ত না করলে ওরাও কিছু করবে না। আমরা পাশ কাটিয়ে চলে গেলাম। আমরা বলতে এখন আমার সাথে আছে প্রমি আর তাজওয়ার। নাভিদ সামনে আর রিহা আজমাঈন আফ্রিদি পিছনের দিকে। আফ্রিদি আর  তাজওয়ার পানি নিতে ভুলে গেছে ।আমাদের কয়েকজনের থেকে কিছুক্ষণ পরপর এক চুমুক করে খাচ্ছে ।পথিমধ্যে একটা পাথরে বসে আমরা তিনজন সেদ্ধ ডিম খেয়ে নিলাম। ডিম খাওয়া শেষে আবারো সেই ইতালিয়ান কাপলের সাথে দেখা । কমপক্ষে 20 থেকে 30 বার ওদের সাথে আমাদের দেখা হয়েছে , তাই স্মৃতিস্বরূপ তাদের সাথে সেলফি তুললাম।

বেজ ক্যাম্প ভিউপয়েন্টস


সেলফি পর্ব শেষে আবারো হাঁটার শুরু। অলটিমিটারে দেখাচ্ছে ৩৯০০ মিটারের কাছাকাছি এসে গেছি ।শরীর তখন কোনভাবেই চলছে না ।বাতাসের তোড়ে  মনে হচ্ছিল কখনো ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাই কি না । সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে উপরে উঠতে থাকলাম।  খালি সামনের স্টেপে মনস্থির করছি, বেশি উপরে তাকাচ্ছি না । সবশেষে অনেক দূরে কিছু ঘরবাড়ি ,অস্থায়ী হোটেলের মতন দেখা গেল । বুঝতে পারলাম বেজ ক্যাম্প ভিউ পয়েন্টস এর কাছাকাছি এসে পড়েছি । মাত্র তখন ৪-৫টা স্টেপ বাকি। কিন্তু  শরীর যেন অসাড় হয়ে গিয়েছিল। নাভিদ উপর থেকে ডাকছিল “আর মাত্র দুই স্টেপ, উঠে পড়!” আমার শরীর মন কোনটাই চলছে না তখন। হুট করে সজ্ঞানে আসতেই দ্রুত উপরে উঠে বসলাম আর আমার জীবনের এ যাবৎকালের সর্বাধিক চমকপ্রদ মুহূর্তের  দেখা পেলাম ।

বেজ ক্যাম্প, চা, অন্নপূর্না আর আমি


এখন উচ্চতা ৪২০০ মিটার । সামনে বরফাবৃত অবারিত অন্নপূর্ণা পর্বত শ্রেণী। মেঘ - আকাশ - পর্বত সব মিলে কী রকম লাগছিল সেটা এখানে লিখে বোঝানোর মতোন ভাষা নেই।  হিমালয় থেকে ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। মুখের সামনে দিয়ে মেঘ স্পর্শ করে যাচ্ছে। এমন অভূতপূর্ব পরিবেশে পাশের টং দোকান থেকে লাল চা খেলাম। এরকম একটা মুহূর্ত সম্ভবত জীবনে একবারই আসে। হিম শীতল পরিবেশে গরম চা সাথে ঠান্ডা বাতাসের শনশন আওয়াজ- আজীবন মনে গেঁথে থাকার মতোন মুহূর্ত। ঘন্টাখানেক পরে রিহা আজমাইন আর আফ্রিদি বেজ ক্যাম্প ভিউ পয়েন্টে পৌঁছালো ।আমরা অনেকগুলো গ্রুপ ফটো তুললাম, রিলস রিক্রিয়েট করলাম ।ভবিষ্যতে কেউ মারদি হিমাল ট্রেকে গেলে আমাদের এ রিলসগুলাই দেখবে হয়তো !

 

বেজক্যাম্পে অন্নপূর্ণার  সাথে 

তাপমাত্রা তখন হিমাঙ্কের নিচে। কিছু সময়ের জন্য স্নো ফল হলো । আমরা সবাই চিৎকার করে উঠলাম ।যদিও আমি খুব অল্প সময়ের জন্য পেয়েছিলাম তবুও জীবনের এই প্রথম স্নো দেখার মুহূর্ত মোটেও ভুলবার নয়।


বেজ ক্যাম্প ভিউপয়েন্টস


দাঈ প্রাজ্জাল এর সাথে আমরা ৭ জন

পাহাড়ের ওই বুকেতে দাঁড়াই
আকাশের হাতছানিতে সাড়া দিই






আমি আর তাজওয়ার বেলা এগারোটা তে রওনা দিয়ে দেই আবার হাই ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে ।এখন আমাদের রিটার্ন ফেইজ। নামতে কোন সমস্যা হলো না  আমার।  নেপালি কয়েকজন স্টুডেন্ট যারা অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রাজুয়েট, তাদের সাথে কথা বলতে বলতে নিচে নামতে থাকলাম । পরে ওরা অন্য রাস্তা দিয়ে চলে গেলে আমি একাই সাইন ফলো করতে করতে হাই ক্যাম্পে আমাদের হোটেল ম্যাজিক মাউন্টেইন এ চলে আসি এক ঘন্টার মাঝেই ।হোটেলে আমি সবার প্রথমে আসি ,এসে ফোন চার্জ দিতে থাকি । সাথে সাথে ইন্টারনেট  ব্রাউজ করতে করতে কে-৭৯ এর আরভিন আদিত্যের মৃত্যু সংবাদ চোখে পড়ে ।খুব মর্মাহত হয়েছিলাম ওই মুহূর্তটায় ।

যাই হোক দুপুরে এগ ফ্রাইড রাইস দিয়ে লাঞ্চ করলাম । লাঞ্চ শেষ করে খবর পেলাম পোখারায় আন্দোলন চলে, সুইফট টুরিস্ট বাস রাতের বেলা বন্ধ । আমাদের প্ল্যান আচমকা পরিবর্তন করতে হলো । সঞ্জু ভাইয়ের পরামর্শ মতন ঠিক করা হলো আমরা পরদিন পোখারা থেকে বাসের বদলে স্কোরপিও জীপে করে কাঠমান্ডু যাব ।আপাতত আজকের দিনের জন্য গন্তব্য বাদল ডান্ডা ।বাদল ডান্ডায় হিমালায়ান ম্যাজেস্টি তে আজকে আমাদের থাকার কথা।


হাই ক্যাম্প থেকে বাদল ডান্ডায় দেড় ঘন্টার মাঝেই পৌঁছে গেলাম ।নিচে নামার সময় আমাদের কারোরই তেমন সময় লাগছিল না (এমনকি রিহা আজমাইন এর ও না !)। হোটেল হিমালায়ান ম্যাজেস্টি তে রাতের অভিজ্ঞতা সম্ভবত সব হোটেলগুলোর মাঝে সবচেয়ে সেরা অভিজ্ঞতা ছিল। পুল এবং লুডু খেলার ব্যবস্থা ছিল। আমরা সবাই এক্সাইটেড হয়ে খেলা শুরু করলাম আর চিৎকার করতে থাকলাম ।হোটেলে এক সুইস কাপল আমাদের পাশের রুম নিয়ে ছিল। আমাদের বাচ্চা সুলভ আচরণ দেখে ওরা মুচকি মুচকি হাসছিল ।রাতে তারপরে ওদের সাথে কিছুক্ষণ কথা বললাম। আমি রজার ফেদেরারের হিউজ ফ্যান।ছোটবেলা থেকে ফেদেরারের খেলা দেখে আসছি। ওরা শুনে খুবই অবাক হলো।আমি যতটুক ফেদেরারকে নিয়ে জানি ওরাও জানে না।সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালা নিয়ে বললাম। সুইজারল্যান্ড নিয়ে আমার আগ্রহ দেখে ওরা অনেক খুশি হলো। 

হিমালায়ান ম্যাজেস্টি তে ৩৫৫০ মিটার পুল 


৩৫৫০ মিটার লুডো


রাত্রে আমি নেপালের ঐতিহ্যবাহী খাবার তিবেতিয়ান ব্রেডের সাথে জ্যাম ডিনার হিসেবে খেলাম ।সাথে রাত্রে পুল আর লুডো খেলা তো রয়েছেই ।লুডো খেলায় যদিও হেরেছি তবুও 3550 মিটার উচ্চতায় নাটকীয় মুহূর্তে ভরা লুডো খেলার দানগুলোর কথা মনে থাকবে।এ হোটেলের মোটামুটি সবকিছু ভালো হলেও ওয়াশরুম নিয়ে কিঞ্চিৎ অসন্তুষ্টি ছিল ।আর রুমের মাঝের দেয়ালগুলো সাউন্ড প্রোটেকটিভ না- সেজন্য রাতে ঘুমানোর আগে একটু জোরেশোরে গল্পও করা গেল না। কিন্তু সবশেষে আজ রাত্রেই সবচেয়ে বেশি আরামদায়ক ঘুম ঘুমানো গেল। হাই অল্টিটিউট থেকে লো অল্টিটিউড এ আসলে যে সাউন্ড স্লিপ হয় এ কথার যথার্থতা বুঝতে পারলাম।




চতুর্থ দিন ( মারদি হিমাল ট্রেক : গন্তব্য হাই ক্যাম্প)

 

১ জুন, ২০২৫

ভোর সাড়ে চারটার দিকে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল যথারীতি। বরফ ঠান্ডা পানি দিয়ে ওযু করে ফজরের নামাজ পড়লাম ।আফ্রিদি আমার নড়াচড়ায় ঘুম থেকে উঠে পড়ল । অবশ্য দ্বিতীয় দফায় ঘুমিয়ে আবার সাতটায় উঠলাম হাই ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করার জন্য।দাঈ আমাদের উপর কিছুক্ষণ পরে পরেই বিরক্ত হচ্ছিল ।আমরা সবাই একটু লেট করছিলাম প্রতিবার যাত্রা শুরুর আগে।

 

ফরেস্ট ক্যাম্প থেকে যাত্রা শুরুর আগে 

হাই ক্যাম্পের দিকে রাস্তা বেশ খাড়া আগের তুলনায় ।কিছুক্ষণ পরপরই হাঁপিয়ে উঠছিলাম ।এক ঘন্টা পর আমরা রেস্ট ক্যাম্পে পৌঁছলাম । চোখ পড়লো সামনের দিকে মাছাপুছারে পর্বত এর দিকে। ছবির থেকেও সুন্দর দেখতে । নেপালিরা এই পাহাড়কে পূজা করে । ওদের বিশ্বাস মতে এখানে দেবতা শিব অবস্থান করেছিল।  সবাই পালাক্রমে মাছাপুছারের সাথে ছবি তুললাম। যাত্রা শুরু করলাম পরের রেস্টিং স্পট রেসকিউ ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে। ঘন্টা দেড়েকের মাঝে রেসকিউ ক্যাম্পে পৌঁছে সকালের নাস্তা করলাম ।এটা দাঈ এর হোটেল। উনার বিজনেস এখানে । রুটি ডাল দিয়ে সকালের নাস্তা করলাম সবাই, সাথে লাল চা । নেপালিরা রুটিকে ‘চাপাঠি’ বলে।  ওদের রুটি আমাদের মতনই ,তবে কিছুটা চাপা আর শক্ত। আমার রুটি বরাবরই পছন্দের খাবার বিধায় কোন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়নি। দাঈ এর হোটেল দেখে আমাদের কাছে দাম বেশ কম রাখল। নেপালি রুপিতে ৪০০ খরচ করে আমাদের মনে হল রয়েল ট্রিটমেন্ট পেয়েছি। যাইহোক খাবার দাবার শেষে আমরা পাঁচজন আবার যাত্রা শুরু করলাম। রিহা আজমাইন বরাবরের মতোই কিছুটা দেরি করে গেলো । আজমাইনের জুতার সোল ছিঁড়ে গেছে, বেচারা শুরু থেকেই কোন না কোন ঝামেলা পোহাতেই আছে ।

    

রেস্টক্যাম্পে মাউন্টেইন মাছাপুছারের সামনে

পাঁচজন হাঁটতে লাগলাম। এখন পুরোদস্তুর বন জঙ্গল পেরিয়ে চারপাশে বরফাবৃত পাহাড়ের কিছু দৃশ্য উঁকি দিচ্ছিল কিছুক্ষণ পর পর । ট্রেকিং এর সময় প্রমির স্পটিফাই থেকে গান বেজে আসছিল কানে । শব্দের তীব্রতা বুঝে বুঝে আমি আন্দাজ করতাম ওরা আমার থেকে কতটুকু আগে বা পিছে আছে ।ঘন্টা দুয়েক শেষে লো ক্যাম্পে পৌঁছালাম । লোক্যাম্পের হোটেল মালিকদের সাথে নাভিদ আফ্রিদি হিন্দিতে কথা বলল কিছুক্ষণ। পুরো ট্যুর জুড়েই আমার নিজেকে আউটকাস্ট লেগেছে হিন্দি না পারার জন্য। নেপালিরা সবাই হিন্দি বুঝে নেপালি ভাষার পাশাপাশি । ইংরেজিতে কথা বলার সময় আমার ওদেরকে একশো একটা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে বুঝানো লাগতো । লো ক্যাম্পের একজন নেপালি টুরিস্টের সাথে কথা হলো। উনি কিছুটা বাংলা শিখেছে। একটা বিষয় খেয়াল করলাম বিদেশি সবাই কোন একটা বাংলা বাক্য শিখলেও সেটা "আমি তোমাকে ভালোবাসি"। উনার ট্যুরমেট কলকাতার বাঙালি । উনি বলল বাদল ডান্ডা আরো দুই ঘন্টা রাস্তা ।দেরি না করে হাঁটা দিলাম পরবর্তী রেস্টিং স্পট বাদল ডান্ডার উদ্দেশ্যে।

রেস্কিউ ক্যাম্পে দাঈ এর হোটেলে চাপাঠি-ডাল


চারদিকে তখনো বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব। এলিভেশন একটানা বাড়ছেই। চলতে চলতে একজন বাঙালি সদৃশ বিদেশি কে ‘হাই’ দিলাম । ভদ্রলোক জানালো উনি কলকাতার বাঙালি ।ওনার ১২ বছরের ছোট ছেলেকে সাথে নিয়ে মারদি হিমাল ট্রেকে এসেছেন। ইতোমধ্যে বেজ ক্যাম্প থেকে ফিরে আসছেন ।ভদ্রলোক বাংলাদেশেও এসেছেন । বাংলাদেশের মানুষের প্রশংসা করলেন ।কিছুক্ষণ সৌহার্দ্য বিনিময় শেষে আমরা আবারো চললাম বাদল ডান্ডার দিকে।

পাঁচ মিনিটের জন্য সরে যাওয়া মেঘে অকস্মাৎ অন্নপূর্ণা



বাদল ডান্ডায় অন্নপূর্ণা




ঘন্টা দুয়েক পরে বাদল ডান্ডার কাছাকাছি পৌঁছালাম। বিশ্রাম নিতে নিতে চারপাশে মেঘ সরে গেল পাঁচ দশ মিনিটের জন্য। অন্নপূর্ণা শ্রেণীর পর্বতমালা মুহূর্তের জন্য দৃশ্যমান হলো ।অন্নপূর্ণার দৃশ্যপটে আসা আমাদের পুরো ট্রেকিং এর মাঝে এটাই প্রথম। আমরা সবাই এক্সাইটেড হয়ে একের পর এক ছবি তুলতে লাগলাম; দুর্ভাগ্যবশত মেঘ কিছুক্ষণ পরেই সব ঢেকে নিয়ে যায় ।

রেইনকোট এবং অন্নপূর্না


আমরা আবারো বাদল ডান্ডার দিকে ওঠা শুরু করলাম ।এক ঘন্টার কম সময়েই বাদল ডান্ডার হোটেলে পৌঁছলাম লাঞ্চ করার জন্য। লাঞ্চের ডাল ভাত ডিম খেলাম এক হাজার রুপি দিয়ে। উল্লেখ্য ,যত বেশি উপরের দিকে উঠতে থাকবো দাম ততই বাড়তে থাকবে । হুট করে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল। সবাই রেইনকোট পরে নিলাম।আমার রেইনকোট টা ঢাকা থেকে অর্পিতার থেকে ধার করেছিলাম।ওদের বাহিনী লাস্ট মিডে ইন্ডিয়া মেঘালয় ট্যুরে ওখান থেকে কিনে নিয়ে এসেছে। বাদল ডান্ডার মোবাইল নেটওয়ার্ক আর কাজ করে না। হোটেলের ওয়াইফাই কানেক্ট করে বাসায় একটা হোয়াটসঅ্যাপ টেক্সট দিয়ে রওনা হলাম আজকের চূড়ান্ত গন্তব্য হাই ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে।

বৃষ্টি শেষে এক চিলতে রোদের হাসি


বাদল ডান্ডা থেকে হাই ক্যাম্পের রাস্তা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়েছে । চারপাশে সাপোর্ট নেই ,পা ফসকে গেলে সরাসরি খাদে যেখান থেকে উদ্ধার পাবার কোন উপায় মাত্র নেই ।এখন আর বন জঙ্গল নেই, চারপাশে শুধু পর্বত শ্রেণী আর মাঝে সরু ট্রেকিং এর রাস্তা। অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে ,রেইনকোট ভিজে একাকার ।আফ্রিদি সবার এস্থেটিক ছবি তুলে দিচ্ছিল, কিন্তু ওর ছবি কেউ তুলে না দিয়ে সামনে চলে যাওয়ায় বেচারা বেশ মন খারাপ করলো । আমার ছবি তোলার হাত তেমন ভালো না ,দু তিনবার ব্যর্থ চেষ্টা করে সামনের দিকে আমিও যাত্রা শুরু করলাম।

 

সেলফি উইথ রংধনু

ঘন্টা দেড়েকের মাঝে একটা ছোট ময়দানের মতন জায়গায় এসে রেস্ট নিলাম। আমার পুরনো রোগ অকিউলার হাইপারটেনশন আবার জেঁকে বসেছে। চোখের ব্যথা বাড়তে বাড়তে পুরো মাথায় ব্যথা ছড়িয়ে পড়েছে। হাই অলটিটিউড আমার মতন  পেশেন্টদের জন্য পুরোপুরি রেড ফ্ল্যাগ- জিনিসটা তখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম । IOP lowering drop দিলাম চোখে আর সাথে  প্যারাসিটামল খেয়ে নিলাম । পুরো ট্যুরে এই একটা দিনেই আমার চরম দুর্বিষহ লাগছিল। এমনিতে আমার ফিজিক্যাল ফিটনেস ভালো হলেও এই চোখের আর মাথার ব্যথায় একসময় give up করার চিন্তা মাথায় কাজ করছিল।

এসব ভাবতে ভাবতে দেখি হাতের পাশে রংধনু দেখা যাচ্ছে, মানে একদম স্বপ্নের থেকেও বেশি সুন্দর একটি দৃশ্য। রংধনুর একদম উপরিভাগের পাশে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। ক্রমাগত আমাদের ছবি ভিডিও তোলার ফ্ল্যাশের শব্দে চারপাশ আলোড়িত হয়ে উঠল।

হাই ক্যাম্পের বাকি আর কিছুটা পথ!


চারপাশে অনেকগুলো ঘোড়া চড়ে বেড়াচ্ছিল । ঘোড়াগুলোর সাথে সম্ভবত কুকুরগুলোর শত্রুতা আছে। প্রাণীর প্রজাতির মাঝে আন্তঃদ্বন্দ্ব এই প্রথম খেয়াল করলাম । ঘোড়াগুলোকে আদর করলে কুকুরগুলো রাগ করে দূরে সরে যায়,আবার ঘোড়াগুলো কুকুর গুলোর দিকে তেড়ে আসে। এসব দেখতে দেখতে আমরা পথ ধরলাম হাইক্যাম্পের উদ্দেশ্যে।

পথ ক্রমাগত কঠিন তর হতে লাগলো ।সাথে হাইপক্সিয়ার মাত্রা বাড়লো ।এত কিছু ভুলে গিয়ে আমরা এগোতে থাকলাম। ঘন্টা দুয়েকের মাঝে হাইক্যাম্প ভিউ পয়েন্টে পৌছালাম ।সূর্যাস্তের সময় তখন। খণ্ড খন্ড মেঘের মাঝে সূর্যের সোনালী আভায় পুরো আকাশ ছেয়ে গেছে । বিস্ময়ের দৃষ্টিতে উপভোগ করলাম দৃশ্যগুলো ।এখন সব পাহাড়ই মোটামুটি দৃশ্যমান, সূর্যের আলোয় পাহাড়ের বরফগুলো চকচক করছে ।মন চাইছিল আজীবন দৃশ্যগুলো চোখের সামনে গেঁথে থাকুক। সন্ধ্যা পেরোতেই আমরা হাই ক্যাম্পের হোটেলে উঠে পড়ি ।হোটেল মালিকের স্বভাব মোটেও ভালো লাগল না ।ওয়াইফাই এর পাসওয়ার্ড দিতেই গড়ি মসি করছিল। আম্মুকে কল দিব এ কথা বলার পরে শেষমেষ দিল। হোটেলে লবিতে চিমনির পাশে একজন পাকিস্তানি মত দেখতে ভদ্রলোক বসে ছিল। ভারত পাকিস্তান দুই দেশেরই রক্ত উনার মাঝে মিশে আছে। গল্প গুজব করতে বেশ পছন্দ করেন। আমরা পুরো বিধ্বস্ত তারপরেও উনার গল্প শুনিয়ে গেলেন, আমরাও শুনলাম।

হাই ক্যাম্প ভিউপয়েন্টস এ সূর্যাস্ত


রাতে ভেজ সুপ অর্ডার করলাম খাওয়ার জন্য। অর্ডার আসতে দেরি হবে দেখে ওয়াশরুমে গেলাম । অস্বাভাবিক ঠান্ডা পানি । হাত একদমই জমে যাচ্ছিল ।লোকেশনে তাপমাত্রা দেখাচ্ছিলো এক থেকে দুই ডিগ্রী সেলসিয়াসের মতো । যাইহোক ফ্রেশ হয়ে চিমনির পাশে স্যুপ খেতে আসি। প্রচন্ড রকমের বিস্বাদ, দুই চুমুক দিয়ে আর এক ফোঁটাও খেতে পারলাম না ।আমার পাশে নাভিদও স্যুপ অর্ডার করেছিল। টমেটো সস গ্রিন সস সহ যত রকমের সস আছে সব মিশিয়েও খাওয়ার মতন অবস্থায় আনতে পারল না। আমার এদিকে চোখ মাথাব্যথায় অস্বাভাবিক খারাপ অবস্থা । Nausea ও শুরু হয়েছে । হিমাঙ্কের কাছাকাছি তাপমাত্রায় গায়ে থার্মাল ইনার উইন্ড ব্রেকার জড়িয়ে কম্বল লেপ মুড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ি । ঘুমের মাঝেও কয়েকবার স্বপ্ন দেখেছি এই মাথাব্যথায় আগামীকালকে সব ভেস্তে যাচ্ছে ।আগামীকালের চূড়ান্ত গন্তব্য মারদি হিমাল বেজ ক্যাম্প ,যেটা আমাদের পুরো ট্রেকিংয়েরই ফাইনাল ডেস্টিনেশন।

 

তৃতীয় দিন( মারদি হিমাল ট্রেক : গন্তব্য ফরেস্ট ক্যাম্প)

 

৩১ মে ২০২৫

আমি ভোর ছয়টার আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়ি। সকালে উঠে ফজরের নামাজ পড়ে নিলাম ,নেপালে আসার পর থেকে বেশিরভাগ ওয়াক্তই কাযা করতে হচ্ছিল। কিছু করার ছিল না ।সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট না করেই রওনা দিলাম ।

গৌরিশংকরের সামনে মারদি হিমাল ট্রেকের উদ্দেশ্যে


জীপে করে রওনা হওয়ার আগে পাশের মানি এক্সচেজে ৫০ ডলার ভাঙিয়ে নিয়েছিলাম। সে মুহূর্তে ওই মানি এক্সচেঞ্জে কর্মরত মহিলার আচরণ আমাকে মুগ্ধ করেছিল ।বলেছিলাম ১০০ ডলারের নোট দিয়ে ৫০ ডলার চেঞ্জ করে দিতে , বাকিটা এনপিআর এক্সচেঞ্জ করে দিতে। উনি বলার সাথে সাথে ভোঁ-দৌড় দিয়ে উনাদের লকার থেকে আমার জন্য ডলার চেঞ্জ করে এনে দিল।  আমি বলছিলাম আমার হাতে পর্যাপ্ত সময় নেই ।

গাড়ি চলে না !


 খুব ভালো একটা ইমপ্রেশন নিয়ে রওনা হলাম পিতাম দেউড়ালির উদ্দেশ্যে । জীপের পাশের জানালা দিয়ে পাহাড়ি দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। এটা বান্দরবানের রাস্তার পাশের দৃশ্যের মতো অনেকটা ।রাস্তার পাশের মানুষগুলো দেখলাম জ্যাকেট পরে আছে ,তাপমাত্রা মোটামুটি ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর কাছাকাছি। তারপরেও ওদের পরনে জ্যাকেট ফুল প্যান্ট দেখে অবাক হলাম ।সরু রাস্তা দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে গাড়ি উঁচু রাস্তায় উঠছিল ।জানালার পাশ দিয়ে সবুজ পাহাড় দেখা যাচ্ছে । এখন অবধি বরফ আবৃত পাহাড় চূড়ার দেখা মেলেনি ; বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের মতই পাহাড়গুলো, কিন্তু উচ্চতা একটু বেশি। আমরা গিয়েছি বর্ষা মৌসুমে ,রাস্তা পুরো কর্দমাক্ত।  অনেক পাথর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা। অর্ধেক রাস্তা পেরোনোর পরে গাড়ির ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায় ।সাথে সাথে ওই গাড়ির সাথে আমাদের যাত্রার ওখানেই সমাপ্তি।


পিতাম দেউড়ালিতে ভূড়িভোজ(!) শেষে


তখনো পিতাম দেউড়ালি থেকে আমাদের অর্ধেকের বেশি রাস্তা বাকি । আমরা দিগভ্রান্তের মতন দাঁড়িয়ে আছি রাস্তায়। ট্রেকিং শুরু হতে না হতেই এমন অবস্থার মুখোমুখি হতে হলো।হুট করে আজমাইন চেঁচিয়ে উঠল ওর জুতো দিয়ে জোঁক উঠছে ।এটা শুনে আফ্রিদি মাইশা দুজনই বলতে লাগলো ওদের পায়ের নিচের দিকে কিছুটা চুলকানি বোধ করছে ।বলতে বলতেই দেখে জোঁক ওদের পায়ে বসে আছে ,আর বেশ অনেকক্ষণ ধরেই আছে ।আমি বাসা থেকে লবণ নিয়ে এসেছিলাম ।লবণের বক্সটা বের করে আমি পায়ে হাতে লবণ মাখলাম ,বাকিরাও নিল । সাথে লীচ সক(leech sock) পরে নিলাম।

 

 সবাই হঠাৎ করে দেখি রিহা আজমাইন চিৎকার করছে । হাত থেকে কিছু একটা পড়ে গেছে। শুরুতে ভেবেছিলাম মোবাইল ফোন, তারপর দেখি আজমাইনের পাসপোর্ট ।উপর থেকে পাহাড়ি সরু ঝর্ণার পানি রাস্তার পাশ দিয়ে আড়াআড়ি ভাবে নিচের দিকে গেছে। ওখানে রাস্তার পাশে ওরা দাঁড়িয়েছিল। নিচের দিকে আজমাইন ঝুঁকতেই ফ্যানি প্যাক থেকে পাসপোর্ট নিচে পড়ে যায়। সাথে সাথে ও কিছুক্ষণের জন্য একদম স্তম্ভিত হয়ে থাকে। আমরা কয়েকজন দৌড়ে রাস্তার অপর পাশে গিয়ে দেখি এটা ওখানে একটা ছোট ডালের গোড়ার দিকে কোন মতনে আটকে আছে । স্রোতের তোড়ে একদম ভেসে যাবে যাবে অবস্থা ।গাড়ির ড্রাইভারকে আমরা চিৎকার করে সাহায্য করতে বলতে থাকলাম ।সম্ভবত উপরওয়ালা চেয়েছিলেন আমাদেরকে সহজে এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দিবেন- সেজন্যই গাড়ির ড্রাইভার মামার সাহায্য নিয়ে পাসপোর্ট উদ্ধার করা সম্ভব হলো । অন্যথায় এ মুহূর্তটা পুরো ট্যুরের ট্র্যাজিক মোমেন্ট হয়ে থাকতো যেখানে  “শুরুর কথা বলার আগেই শেষ “

 

আমরা যে এলাকায় আটকে আছি সেখানে আমার Ncell মোবাইল অপারেটরের কোন নেটওয়ার্ক নেই ।নাভিদের Ntel সিমে নেটওয়ার্ক পাওয়া গেল । সাঞ্জু  ভাই আমাদের টুরগাইড ,ভালো পরিপাটি অমায়িক মানুষ । শুরু থেকেই আমাদের হেল্প করে যাচ্ছেন ।উনার সাথে আজমাইন ফোনে কথা বলে আরেকটি গাড়ি ঠিক করল ।সেই গাড়িতে ব্যাগ পোটলা উঠিয়ে  আমরা রওনা দিলাম আবারও পিতাম দেউড়ালির উদ্দেশ্যে ।

 

সকালে আমরা কেউ ব্রেকফাস্ট করে বের হইনি ।আর দুপুরে বা বিকালের মাঝে ফরেস্ট ক্যাম্প পৌঁছে যাব ভেবে আমি ব্রেকফাস্ট অর্ডারও করিনি । প্রায় এক দেড় ঘণ্টার জার্নি শেষে আমরা পৌঁছলাম পিতাম দেউড়ালি। চারদিকে তখন মেঘ দেখা যাচ্ছে।তাপমাত্রা এখন পোখারা থেকে বেশ অনেকখানি কম ।ঠান্ডা বাতাসের তীব্রতা বেড়ে গেছে ।বাকি কয়েকজন ম্যাশড পটেটো অর্ডার দিয়েছিল ।আমরা যারা অর্ডার করিনি তারা কিছুটা শেয়ার করে খেয়ে নিলাম ।যতটুকু সোজা ট্রেকিং কে ভেবেছিলাম তার থেকে বেশ কয়েকগুণ কঠিন হবে আন্দাজ করতে পারলাম ।

ট্রেক অফিসিয়ালি শুরু


আবারো খাওয়া-দাওয়া পর্ব শেষ করে আমাদের গন্তব্য ফরেস্ট ক্যাম্পের দিকে রওনা হলাম ।আমাদের সাথে এখন নতুন সঙ্গী গাইড প্রাজ্জাল  ভাই ।সামনে একদম ট্রেকের শেষ দিন অবধি থাকবেন আমাদের সাথে । ট্রেকিং শুরু করলাম ফরেস্ট ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে । এখন শুরু থেকেই অক্সিজেনের স্বল্পতা অনুভব করতে পারছিলাম ।উচ্চতা ২১০০ মিটার । বলা বাহুল্য বাংলাদেশের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গড় উচ্চতা গড়ে প্রায় টেনে টুনে ৮ মিটারের কাছাকাছি আর সর্বোচ্চ উচ্চতার পাহাড় তাজিনডং এর উচ্চতা ১২৮০ মিটার । কিছুক্ষণ প্রায় দশ মিনিটের মতো যেতে না যেতেই সবার পানি খাওয়া লাগলো। প্রাজ্জাল ভাই সবাইকে ডি হাইড্রেট না হওয়ার জন্য পরামর্শ দিলেন । সাথে উনাকে ‘দাঈ’ ডাকার জন্য বললেন। নেপালি ভাষায় বড় ভাইকে ‘দাঈ’ ডাকা হয়। যাই হোক , আমরা আবারো যাত্রা শুরু করলাম ফরেস্ট ক্যাম্পের দিকে।  আমার ন্যাচারাল পেইস একটু বেশি ।সবকিছুতে তোড়জোড় বেশি করি যেটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খারাপ, ট্রেকিংয়ের জন্য আরো খারাপ । মোটামুটি পুরো ট্রেক জুড়ে আমি ,নাভিদ , প্রমি ,তাজওয়ার এগিয়ে ছিলাম যেটাকে আমরা নাম দেই এজেপি গ্রুপ (এগিয়ে যাওয়া পাবলিক)। মাঝে মাঝে আফ্রিদির আবির্ভাব ঘটতো এই গ্রুপে অবশ্য। ঘন্টাখানেক চলা- থামা- চলা এমন করে সামনে এগোতে থাকলাম ।

 

ট্রেকিং পর্ব -১ 

মারদি হিমাল ট্রেকের একটা নির্ধারিত সাইন আছে- সাদা -নীল পতাকার মতন। আর্জেন্টিনার পতাকা অনেকটা, মাঝে কেবল সূর্য টা নেই ।নেপালি কয়েকজন ও ট্রেকিং করছিল আমাদের সাথে ।ওদের থেকে বিষয়টা জানলাম । এটা জানার পর থেকে হাঁটার গতি অনেক বেড়ে গেল । যেহেতু এখন আর দাঈ প্রাজ্জালের সাহায্য লাগছে না ,আমি আর নাভিদ অনেকখানি সামনে এগিয়ে গেলাম । পেছনে অনেকক্ষণ ধরেই কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না । অনেকখানি উপরে ওঠার পর পানি শেষ হয়ে গেল ।একটা অস্থায়ী হোটেলে কিছুক্ষন বিশ্রাম নিচ্ছিলাম ।পানি ভরতে চাইলাম। হোটেলের লোকটা সম্ভবত নেশাগ্রস্ত ছিল , ঝুলতে ঝুলতে ১০০ রুপি চাইল পানি ভরার জন্য । আমি ৫০ রুপি দিয়ে সামনে চলতে শুরু করলাম ।

 

ট্রেকিং পর্ব-২

কিছুক্ষণ যাওয়ার পর দুটো রাস্তার ইন্টার সেকশন পড়লো।  আমরা (আমি আর নাভিদ) ট্র্যাকের সাইন ধরে ডান দিকে গেলাম , কিন্তু কিছু রাস্তা যাওয়ার পর আর নীল সাদা সাইন পাচ্ছিলাম না । শুধু লাল -হলুদ পতাকা কিছুদূর পরে পরে । আমি আবারও পিছে অনেক দূর দৌড়ে একটা হোটেলে জিজ্ঞেস করে আসলাম ঠিক রাস্তায় আছি কি না -ওরা বলল রাস্তা ঠিকই ছিল, এখানে পতাকা গুলো ম্যারাথন প্রতিযোগিতার সময় লাগানো হয়েছিল । হতাশ হয়ে আবারো আগের জায়গায় ফিরে আসলাম আর হাঁটতে শুরু করলাম। গতি অনেকখানি বাড়ালাম। সামনে এক জায়গায় হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে জোরে চিৎকার দিয়ে উঠেছিলাম। ভাবলাম পা মচকে এখানেই বুঝি সব শেষ । সৌভাগ্য ক্রমে কোন সমস্যা হয়নি কিছুক্ষণ খোঁড়ানো বাদ দিলে ।

ট্রেকিং পর্ব-৩




ট্রেকিং পর্ব-৪

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল। সন্ধ্যার ছয়টার আশেপাশের সময় তখন, বাংলাদেশ সময় থেকে নেপালের সময় 15 মিনিট পেছানো। চারপাশ থেকে থেকে হুট করে ঘন্টার আওয়াজ পাওয়া গেল ।গরুর পাল একযোগে মালিকের বাড়ি ফিরছিল, পাশে দিয়ে আমাদের কে দুটো কুকুর অনুসরণ করছিল। শেষমেষ ট্রেকের শেষ দিন পর্যন্ত এ দুটো কুকুর আমাদের সাথে সাথে গিয়েছে ,এটা একদমই বিচিত্র অভিজ্ঞতা ।যখন কিছুদূর সামনে গিয়ে দেখলাম “ওয়েলকাম টু ফরেস্ট ক্যাম্প “ তখন মনের আনন্দে আচমকাই চিৎকার করে উঠলাম ।

বহুল প্রতীক্ষিত ফরেস্ট ক্যাম্প !


ফরেস্ট ক্যাম্পে পৌঁছানোর সাথে সাথে তুমুল বৃষ্টি শুরু হল। সাথে সাথে অন্ধকারও নেমে আসলো। তবে বিস্ময়কর ভাবে বৃষ্টির ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর সোনালী লাল আভায় পুরো দিগন্ত বিস্তীর্ণ হয়ে গেল ।এটা ট্রেকের অসম্ভব সুন্দর দৃশ্যগুলোর মাঝে একটি ।আমি আর নাভিদ অন্য আরেকটা রেস্টুরেন্টে নাস্তা করে নিলাম ।পাশে বিদেশি এক কাপলের সাথে দেখা হল যাদেরকে সেই পোখারা থেকেই টাইম টু টাইম দেখে আসছি। ভদ্রলোকের ইংলিশ একসেন্ট শুনে আমি বুঝতে পারলাম উনারা ইটালিয়ান কাপল। উনি আমার আন্দাজ শুনে বিস্মিত হয়ে গেলেন। হা হা !

 


বৃষ্টি শেষে হিমালয়ের সোনালি রোদ্দুর,ফরেস্ট ক্যাম্প থেকে তোলা!



 



ফরেস্ট ক্যাম্পের আকাশে লক্ষ তারা




ফরেস্ট ক্যাম্পের তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে ,উচ্চতা ছিল ২৫৫০ মিটারের কাছাকাছি। আমাদের মতন বাঙ্গালীদের জন্য যা একেবারেই অনভিপ্রেত। চিমনির পাশে বসে বাকিরা ডিনার করল। ফরেস্ট ক্যাম্পের হোটেল মালিকের ব্যবহার তেমন সুবিধার লাগল না ।ফরেস্ট ক্যাম্পের ওয়াশরুম মোটামুটি ভালই, হিটারের ব্যবস্থা ছিল যদিও টাকার বিনিময়ে ।রাতে বৃষ্টি শেষে আকাশ একদম পরিষ্কার ,অনেক বেশি নক্ষত্র রাজি দেখা যাচ্ছে যেটা বাংলাদেশের অপরিষ্কার আকাশে একেবারেই দূরূহ একটা ব্যাপার। মাঝের উঠানে আমরা গ্রহতারার ছবি তুলে কিছুক্ষণ গল্প গুজব করে রাতে ঘুমাতে গেলাম। হিমালয়ের কাছকাছি দৃশ্যমান সমতলে এটাই আমাদের প্রথম রাত্রিযাপন। পরের দিনের গন্তব্য মারদি হিমাল হাই ক্যাম্প।

দ্বিতীয় দিন (পোখারায় ঘোরাঘুরি )

 

৩০ মে,২০২৫

ছবির মতন সুন্দর শহর পোখারা ।কাঠমান্ডু থেকে ছেড়ে আসা বাস পোখারায় পৌঁছালো সকাল সাতটার দিকে । কাঠমান্ডু পোখারা রুটে দুইটা ট্রাফিক অ্যাক্সিডেন্ট ঘটার কারণে রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামের অবস্থা ছিল ভয়াবহ ।আমরা তাই নির্ধারিত সময় থেকে তিন ঘন্টা দেরিতে পৌঁছালাম পোখারায় ।নেপালে তখন পরিবহন ধর্মঘট চলে ,কোন গাড়ি বা ক্যাবের চিহ্নমাত্র নেই। রাস্তায় অনেক চেষ্টা করেও পছন্দ মতন ভাড়ায় গাড়ি ম্যানেজ করতে না পারায় আমরা পায়ে হেঁটেই রওনা দিলাম।স্যুটকেস গুলোর অতিরিক্ত ওজন বহন করার ঝামেলা বাদে কোনো সমস্যা ছাড়াই হোস্টেলে পৌঁছালাম।

       

প্যারাগ্লাইডিং টেক অফের আগে


     

পাখির চোখে পৃথিবী






নেপালের অবকাঠামো অনেক সুসজ্জিত।বহুতল  ভবনের উপস্থিতি বলতে গেলে একদমই নাই। আমাদের হোস্টেল ছিল দোতলা।হোস্টেলের নাম  গৌরিশংকর ব্যাকপ্যাকার্স।ছিমছাম ঘরানার লো    কস্ট হোস্টেল।আমাদের মতোন ‘গরিব’ মানুষের জন্য বিলাসবহুল টাইপ হোটেল ভাড়া করা মানে নিজেদের বাজেটের সর্বাংশ খোয়ানো।যাই হোক,গৌরিশংকর এর চারপাশে সাজানো গাছগাছালি আর হোটেল মালিকের বন্ধুপ্রতিম আচরণ মুগ্ধ করেছে বারবার।

                       

আমাদের হোটেলে বুকিং ছিল ওইদিন দুপুর ১২ টা থেকে। ১২ টার আগে আমরা ব্যাগ সহ করিডোরের পাশের গেস্ট রুমে লবিতে বসলাম।সামনের দোকান থেকে দই আলু পরাটা চাটনি দিয়ে ব্রেক ফাস্ট করে নিলাম। অনেক আশা নিয়ে মিল্ক কফিও অর্ডার করেছিলাম। কিন্তু আশাহত হলাম স্বাদ নিয়ে।দুধে পানির ঘনত্ব অনেক বেশি।বাংলাদেশে চা কফি দামে সস্তা,মানেও অনেক ভালো।নেপাল বাংলাদেশ তুলনা করা দুরূহ। এখন অবধি নেপালে সব কিছু বাংলাদেশ থেকে ২-৩ গুণ বেশি ব্যয় বহুল মনে হয়েছে।

 

বৃষ্টিস্নাত পোখারা

নাস্তা শেষ করে অপেক্ষা করতে লাগলাম এক্টিভিটিজ এর জন্য। শুধু প্রমি,আজমাইন আর তাজওয়ার বাঞ্জি দিল।বাকিরা আমরা প্যারাগ্লাইডিং এর জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম।প্যারাগ্লাইডিং এর অভিজ্ঞতা অভূতপূর্ব। এটা শুরুতে বিপজ্জনক মনে হলেও একবার উঠার পরে এটাই সবচেয়ে বেশি রিল্যাক্সিং মনে হয়। প্যারাগ্লাইডিং এর পাইলট আর ইন্সট্রাক্টর সময় ধরে কিছুক্ষণ বুঝানোর পর টেক অফ করার জন্য রেডি হই।টেক অফের প্র‍থম ৫ সেকেন্ড ঘোরের মাঝে ছিলাম। যদিও এত জোরে চিৎকার করছিলাম,সবাই নাকি ২০ সেকেন্ড অবধি আমার গলা শুনতে পাচ্ছিল! ১৫-২০ মিনিট ফ্লাইট এ থেকে তারপর পাইলট ল্যান্ডিং করলো। ল্যান্ডিং এর টাইমে বেশ কয়েকবার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নির্ধারিত জায়গায় বেশ দক্ষতার সাথে পাইলট আমাকে ল্যান্ড করালো।প্যারাগ্লাইডিং এর মুহূর্ত গুলোও আমার আজীবন মনে থাকবে।পাখির চোখে পৃথিবীকে দেখা - মনে রাখার মতোন দৃশ্য ছিল সেটা।বাসা থেকে আম্মু বারবার নিষেধ করায় অন্য এক্টিভিটি গুলো করিনি। নেপালের পাইলটের সাথে বেশ অনেকক্ষণ প্রলাপ পারলাম, যেটা আমার চির চায়িত বৈশিষ্ট্য।

    

রাত্রির গৌরিশংকর লবি

দুপুর দুইটা নাগাদ পোখারায় গৌরিশঙ্কর হোস্টেলে পৌঁছালাম ।আমি আর আফ্রিদি বাদে বাকি সবাই রিভার রাফটিং এ গেল ।আফ্রিদি তখন হোস্টেলের রুমে ঘুমোচ্ছে ।এটা লিখতে লিখতে একটা কথা মনে পড়ল- যখন সবাই প্যারাগ্লাইডিং এর জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল তখন ঘুমন্ত অবস্থায় আফ্রিদির মুখে হোস্টেলের কুকুরটি চেটে দেয় -- বেচারা হন্তদন্ত হয়ে ঘুম থেকে উঠে ।যাই হোক, আমি আফ্রিদিকে হোস্টেলে রেখে পোখারার মার্কেটে হালাল খাবার খুঁজতে বের হলাম ।রাস্তায় হাঁটার সময় পাশ দিয়ে গ্রোসারি গুলোর দাম দেখছিলাম।কোন কিছুর দামই বাংলাদেশের চেয়ে কম মনে হল না; জামা কাপড় সবকিছুই ১০০০ নেপালী রুপির উপরে। সকালে সাতশ রুপি দিয়ে একটি হ্যাট কিনেছিলাম পোখারার একটা দোকান ইয়াক এন্ড টি থেকে (নাম ভুল হতে পারে)-- যেটা কাঠমান্ডুতে এক হাজার রুপির কমে কোন ভাবেই দিতে রাজি হয়নি।

 

পোখারা চায়না টাউন

দেখতে দেখতে অনেকটা রাস্তা পেরিয়ে হাতের ডান পাশে একটা হালাল রেস্টুরেন্ট পেয়ে যাই । হোটেলে ডাল ভাত এবং ডিম খেয়ে নিলাম ১০০০ রুপিতে ,বাংলাদেশে যেটা খেতে আমার ১০০ টাকাও হয়তো লাগলো না । খেয়ে দেয়ে আবার হেঁটে হেঁটে পোখারার হোস্টেলে পৌঁছলাম ,গিয়ে ধুম করে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি সবাই রিভার রাফটিং শেষে হোস্টেলে পৌঁছে গেছে ।সন্ধ্যার পরে সবাই ডিনারের জন্য বের হয়ে যাই।

ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছিল, রাস্তার চারপাশের দোকান থেকে বাতিগুলোর আলোর প্রতিফলন হচ্ছিল । শান্ত নিরিবিলি বৃষ্টিস্নাত আবহাওয়ায় আমরা পোখারায় চড়ে বেড়াচ্ছি ।লাযিয রেস্টুরেন্টে খাবার বুকিং দিলাম সবশেষে । লাযিয এর মালিক বেশ ভালো বাংলা বুঝে আর বলতেও পারে। দুবাইতে উনি যখন ছিল তার রুম মেট রা সবাই বাঙালি ছিল। সেই সূত্রে বাংলা অনেক ভালো শিখে গেছে।

রেস্টুরেন্টে খাবার দাবার পর্ব শেষ করে পরদিন ট্রেকিং এর জন্য শুকনা খাবার আর পানি নিয়ে নিলাম একটা শপিং মল থেকে। খাবার হিসেবে একটা পী নাট বার আর চকলেট নিয়েছিলাম ।আবারো সেই এক হাজার রুপির মতন খরচ হয় । চায়না টাউনের সামনে আমি নাভিদ আফ্রিদি প্রায় ১০০ টার মতন ট্রায়াল পোজ দিয়ে ছবি তোলার চেষ্টা করি ।সবকিছু শেষ করে হোটেলে ব্যাক করলাম ।আগামীকাল থেকে মারদি হিমাল অভিমুখী ট্রেক শুরু হওয়ার কথা। সেজন্য রাত ১২ টার মাঝেই আমরা সবাই মোটামুটি ঘুমিয়ে পড়ি।

প্রথম দিন ( কাঠমান্ডু অবতরণ )

 

২৯ মে,২০২৫

সকাল থেকেই পুরোদমে বৃষ্টি চলছে। শুনেছি বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ তৈরি হয়েছে। এতদিন কাঠফাটা গরমের শেষে  আজকে যাত্রা শুরু দিনই এমন মুষলধারে বৃষ্টি হওয়া লাগল !

যাই হোক, ফ্লাইট  দুপুর ১২:৩০টার দিকে। দিন ছিল বৃহস্পতিবার। এদিন সরকারী কার্যদিবসের শেষ দিন, আবার এমন বৃষ্টি। তো যা হওয়ার তাই হলো …অসহনীয় জ্যাম পুরো রাস্তায়। আমি আব্বুর সাথে বাসা থেকে বেরোলাম আনুমানিক ৯টার দিকে ।কয়েক গ্রুপে ভাগ হয়ে আমার বাকি বন্ধুরা এয়ারপোর্টে পৌঁছালো।রিহা, আজমাইন, আফ্রিদি  হয়তো আর কিছুক্ষণ দেরি করলেই ইমিগ্রেশন মিস করত !

তা শেষমেষ কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদ দিলে ভালোভাবেই আমরা বিমানে উঠলাম। "আমরা" ছিলামআমি, তাজওয়ার, আফ্রিদি, রিহা, আজমাইন,প্রমি, নাভিদ, মাইশা। আমাদের ফ্লাইট নম্বর ছিল BG 0371 . মেঘলা আকাশ থাকায় সব ফ্লাইটই দেরি করছিল।  আনুমানিক :০০টার দিকে আমাদের  ফ্লাইট নেপালের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। প্লেনটিতে যাত্রীদের আসনে আধুনিক Live Radar Flight tracker-এর মতোন কিছু লাগা্নো ছিল নাকিন্তু তারপরও বাংলাদেশ এবং নেপালের আকাশ খুব স্পষ্টভাবে আলাদা করা যাচ্ছিল;ঢাকা যেন আরও বেশি আলাদা করা যায় বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে! আমার পাশে একটি ছেলে বসে ছিল, তাকে দেখতে উপর্যুপরি বাঙালি মনে হচ্ছিল। বাঙালি মনে করে বাংলায় দু’একটা কথাও বলতে লাগলাম। বেচারা ১ মিনিট সহ্য করে আমাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করার জন্য অনুরোধ করল ।আমি কিছুক্ষণের জন্য চুপ হয়ে গেলাম। তারপরে বুঝতে পেরে ওর সাথে গল্প জুড়ে দিলাম, যেটা আমার অন্যতম বদ অভ্যাস। ওর নাম নিমেশ। নেপাল থেকে বাংলাদেশে এসেছিল একটা জয়েন্ট কনফারেন্সের ওয়ার্কশপে। ওরও আমার মতোন প্রথম ফরেইন ট্রিপ ছিল এটা।

               

ত্রিভুবন বিমানবন্দর, নেপাল


দেখতে দেখতে আকাশ স্বচ্ছ হয়ে গেল চারপাশে খুব ছোট ছোট বিল্ডিং আর সরু নালাযুক্ত শস্য ক্ষেত দৃশ্যমান হয়ে উঠলো ,বুঝলাম অন্য কোন দেশে প্রবেশ করেছি ।ধীরে ধীরে কাঠমান্ডুর পাহাড়গুলো ধরা দিল, দূরের পাহাড় আর আকাশ যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে ।বিমান থেকে ঘোষণা দিল কিছুক্ষণের মাঝেই আমাদের প্লেন ত্রিভুবন বিমানবন্দরে প্রবেশ করবে। বিমানবন্দরের এই নাম নিয়ে যত বেশি ইতিহাস এই কয়েকদিনে ঘেঁটেছি তার ইয়ত্তা নেই । দোয়া দুরুদ পড়তে পড়তেই হুট করে আমাদের প্লেন কাঠমান্ডুর বিখ্যাত( নাকি কুখ্যাত !) ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণ করল । নামার পর বোর্ডিং এ আমার লাগেজ নিতে গিয়ে এক অদ্ভুত বিড়ম্বনায় পড়লাম। আব্বু গতকালকে লাগেজ নতুন কিনে দিয়েছিল। রঙ মনে আছে খয়েরি বা ব্রাউন টাইপের কিন্তু এই রকম এর প্রায় ১০-১৫ টার মতোন লাগেজ দেখে আমি আমার লাগেজ উদ্ধার করতে পারছিলাম না। পরে বিমান বাংলাদেশের বোর্ডিং ট্যাগ দেখে শিওর হই কোনটা আমার লাগেজ !প্লেন থেকে নামার পরে আবহাওয়ার তারতম্য সেভাবে টের পেলাম না বাংলাদেশ আর নেপালের মাঝে ।  তবে আর্দ্রতার পার্থক্য বেশ নজরে পড়ার মতন ,ঘাম হচ্ছিল না চারপাশে রৌদ্রজ্জ্বল আবহাওয়ার মাঝেও। আমাদের সাথে একই ফ্লাইটে আমাদের বন্ধুদের আরেকটা গ্রুপ- তুষার , একান্ত ওরাও কাঠমান্ডু পৌঁছালো । ওদের ট্রেক অন্নপূর্ণা বেজ ক্যাম্পে। 

                                         

ত্রিভুবন বিমানবন্দরে আমরা


এয়ারপোর্ট থেকে নেমে NCell সিম কিনে নিলাম।পাঠাও কার ভাড়া করে আমরা চললাম বাসস্ট্যান্ডের দিকে। পাঠাও এর ড্রাইভার বেশ আন্তরিক ছিল। বাসস্ট্যান্ডের লোকেশন খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। তাও উনি ধৈর্য নিয়ে সুইফট বাস স্ট্যান্ড খুঁজে দিলেন ।তারপর আমরা আটজন লোকাল বাসে করে থামেলে পৌঁছলাম খাওয়ার জন্য । লোকাল বাসে নাভিদের ১৫ হাজার রুপি চুরি গেল ,খুব বাজে ইম্প্রেশন দিয়েই আমাদের যাত্রা শুরু হল নেপালে ।

থামেল, কাঠমান্ডু



 বিকেলে বাংলাদেশি হালাল হোটেলে রুটি কাবাব খেলাম ।আমি থামেলের টুরিস্ট এরিয়ায় শপ গুলো থেকে জায়নামাজের কাপড় কিনলাম ।একটা হ্যাট কিনতে গিয়েছিলাম ,যাতে অস্বাভাবিক দাম হাঁকাচ্ছিল। শেষমেষ তেমন কিছু কিনতে পারলাম না, রওনা দিলাম পোখারার উদ্দেশ্যে।



সপ্তম দিন ( গন্তব্য বাংলাদেশ )

  ০৪ জুন ২০২৫ সকাল ছয়টার দিকে ঘুম থেকে উঠে যাই। আমি, প্রমি আর নাভিদ বেরিয়ে পড়ি থামেল কাঠমান্ডুর রাস্তায়। সকালে তেমন কোন খাবারের দোকান ...