১ জুন, ২০২৫
ভোর
সাড়ে চারটার দিকে আমার ঘুম
ভেঙ্গে গেল যথারীতি। বরফ
ঠান্ডা পানি দিয়ে ওযু
করে ফজরের নামাজ পড়লাম ।আফ্রিদি আমার নড়াচড়ায় ঘুম
থেকে উঠে পড়ল । অবশ্য
দ্বিতীয় দফায় ঘুমিয়ে আবার সাতটায় উঠলাম
হাই ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করার জন্য।দাঈ
আমাদের উপর কিছুক্ষণ পরে পরেই বিরক্ত হচ্ছিল ।আমরা সবাই একটু লেট করছিলাম প্রতিবার
যাত্রা শুরুর আগে।
![]() |
| ফরেস্ট ক্যাম্প থেকে যাত্রা শুরুর আগে |
হাই ক্যাম্পের
দিকে রাস্তা বেশ খাড়া আগের তুলনায় ।কিছুক্ষণ পরপরই হাঁপিয়ে উঠছিলাম ।এক ঘন্টা পর
আমরা রেস্ট ক্যাম্পে পৌঁছলাম । চোখ পড়লো সামনের দিকে মাছাপুছারে পর্বত এর দিকে। ছবির
থেকেও সুন্দর দেখতে । নেপালিরা এই পাহাড়কে পূজা করে । ওদের বিশ্বাস মতে এখানে দেবতা
শিব অবস্থান করেছিল। সবাই পালাক্রমে মাছাপুছারের
সাথে ছবি তুললাম। যাত্রা শুরু করলাম পরের রেস্টিং স্পট রেসকিউ ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে।
ঘন্টা দেড়েকের মাঝে রেসকিউ ক্যাম্পে পৌঁছে সকালের নাস্তা করলাম ।এটা দাঈ এর হোটেল।
উনার বিজনেস এখানে । রুটি ডাল দিয়ে সকালের নাস্তা করলাম সবাই, সাথে লাল চা । নেপালিরা
রুটিকে ‘চাপাঠি’ বলে। ওদের রুটি আমাদের মতনই
,তবে কিছুটা চাপা আর শক্ত। আমার রুটি বরাবরই পছন্দের খাবার বিধায় কোন সমস্যার সম্মুখীন
হতে হয়নি। দাঈ এর হোটেল দেখে আমাদের কাছে দাম বেশ কম রাখল। নেপালি রুপিতে ৪০০ খরচ
করে আমাদের মনে হল রয়েল ট্রিটমেন্ট পেয়েছি। যাইহোক খাবার দাবার শেষে আমরা পাঁচজন
আবার যাত্রা শুরু করলাম। রিহা আজমাইন বরাবরের মতোই কিছুটা দেরি করে গেলো । আজমাইনের
জুতার সোল ছিঁড়ে গেছে, বেচারা শুরু থেকেই কোন না কোন ঝামেলা পোহাতেই আছে ।
![]() |
| রেস্টক্যাম্পে মাউন্টেইন মাছাপুছারের সামনে |
পাঁচজন হাঁটতে
লাগলাম। এখন পুরোদস্তুর বন জঙ্গল পেরিয়ে চারপাশে বরফাবৃত পাহাড়ের কিছু দৃশ্য উঁকি
দিচ্ছিল কিছুক্ষণ পর পর । ট্রেকিং এর সময় প্রমির স্পটিফাই থেকে গান বেজে আসছিল কানে
। শব্দের তীব্রতা বুঝে বুঝে আমি আন্দাজ করতাম ওরা আমার থেকে কতটুকু আগে বা পিছে আছে
।ঘন্টা দুয়েক শেষে লো ক্যাম্পে পৌঁছালাম । লোক্যাম্পের হোটেল মালিকদের সাথে নাভিদ
আফ্রিদি হিন্দিতে কথা বলল কিছুক্ষণ। পুরো ট্যুর জুড়েই আমার নিজেকে আউটকাস্ট লেগেছে
হিন্দি না পারার জন্য। নেপালিরা সবাই হিন্দি বুঝে নেপালি ভাষার পাশাপাশি । ইংরেজিতে
কথা বলার সময় আমার ওদেরকে একশো একটা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে বুঝানো লাগতো । লো ক্যাম্পের
একজন নেপালি টুরিস্টের সাথে কথা হলো। উনি কিছুটা বাংলা শিখেছে। একটা বিষয় খেয়াল করলাম বিদেশি সবাই কোন একটা বাংলা বাক্য শিখলেও সেটা "আমি তোমাকে ভালোবাসি"। উনার ট্যুরমেট কলকাতার
বাঙালি । উনি বলল বাদল ডান্ডা আরো দুই ঘন্টা রাস্তা ।দেরি না করে হাঁটা দিলাম পরবর্তী
রেস্টিং স্পট বাদল ডান্ডার উদ্দেশ্যে।
![]() |
| রেস্কিউ ক্যাম্পে দাঈ এর হোটেলে চাপাঠি-ডাল |
চারদিকে তখনো
বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব। এলিভেশন একটানা বাড়ছেই। চলতে চলতে একজন বাঙালি সদৃশ বিদেশি কে
‘হাই’ দিলাম । ভদ্রলোক জানালো উনি কলকাতার বাঙালি ।ওনার ১২ বছরের ছোট ছেলেকে সাথে নিয়ে
মারদি হিমাল ট্রেকে এসেছেন। ইতোমধ্যে বেজ ক্যাম্প থেকে ফিরে আসছেন ।ভদ্রলোক বাংলাদেশেও
এসেছেন । বাংলাদেশের মানুষের প্রশংসা করলেন ।কিছুক্ষণ সৌহার্দ্য বিনিময় শেষে আমরা
আবারো চললাম বাদল ডান্ডার দিকে।
![]() |
| পাঁচ মিনিটের জন্য সরে যাওয়া মেঘে অকস্মাৎ অন্নপূর্ণা |
![]() |
| বাদল ডান্ডায় অন্নপূর্ণা |
ঘন্টা দুয়েক পরে বাদল ডান্ডার কাছাকাছি পৌঁছালাম। বিশ্রাম নিতে নিতে চারপাশে মেঘ সরে গেল পাঁচ দশ মিনিটের জন্য। অন্নপূর্ণা শ্রেণীর পর্বতমালা মুহূর্তের জন্য দৃশ্যমান হলো ।অন্নপূর্ণার দৃশ্যপটে আসা আমাদের পুরো ট্রেকিং এর মাঝে এটাই প্রথম। আমরা সবাই এক্সাইটেড হয়ে একের পর এক ছবি তুলতে লাগলাম; দুর্ভাগ্যবশত মেঘ কিছুক্ষণ পরেই সব ঢেকে নিয়ে যায় ।
![]() |
| রেইনকোট এবং অন্নপূর্না |
আমরা আবারো বাদল ডান্ডার দিকে ওঠা শুরু করলাম ।এক ঘন্টার কম সময়েই বাদল ডান্ডার হোটেলে পৌঁছলাম লাঞ্চ করার জন্য। লাঞ্চের ডাল ভাত ডিম খেলাম এক হাজার রুপি দিয়ে। উল্লেখ্য ,যত বেশি উপরের দিকে উঠতে থাকবো দাম ততই বাড়তে থাকবে । হুট করে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল। সবাই রেইনকোট পরে নিলাম।আমার রেইনকোট টা ঢাকা থেকে অর্পিতার থেকে ধার করেছিলাম।ওদের বাহিনী লাস্ট মিডে ইন্ডিয়া মেঘালয় ট্যুরে ওখান থেকে কিনে নিয়ে এসেছে। বাদল ডান্ডার মোবাইল নেটওয়ার্ক আর কাজ করে না। হোটেলের ওয়াইফাই কানেক্ট করে বাসায় একটা হোয়াটসঅ্যাপ টেক্সট দিয়ে রওনা হলাম আজকের চূড়ান্ত গন্তব্য হাই ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে।
![]() |
| বৃষ্টি শেষে এক চিলতে রোদের হাসি |
বাদল ডান্ডা
থেকে হাই ক্যাম্পের রাস্তা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়েছে । চারপাশে সাপোর্ট নেই ,পা ফসকে
গেলে সরাসরি খাদে যেখান থেকে উদ্ধার পাবার কোন উপায় মাত্র নেই ।এখন আর বন জঙ্গল নেই,
চারপাশে শুধু পর্বত শ্রেণী আর মাঝে সরু ট্রেকিং এর রাস্তা। অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে
,রেইনকোট ভিজে একাকার ।আফ্রিদি সবার এস্থেটিক ছবি তুলে দিচ্ছিল, কিন্তু ওর ছবি কেউ
তুলে না দিয়ে সামনে চলে যাওয়ায় বেচারা বেশ মন খারাপ করলো । আমার ছবি তোলার হাত তেমন
ভালো না ,দু তিনবার ব্যর্থ চেষ্টা করে সামনের দিকে আমিও যাত্রা শুরু করলাম।
![]() |
| সেলফি উইথ রংধনু |
ঘন্টা দেড়েকের
মাঝে একটা ছোট ময়দানের মতন জায়গায় এসে রেস্ট নিলাম। আমার পুরনো রোগ অকিউলার হাইপারটেনশন
আবার জেঁকে বসেছে। চোখের ব্যথা বাড়তে বাড়তে পুরো মাথায় ব্যথা ছড়িয়ে পড়েছে। হাই
অলটিটিউড আমার মতন পেশেন্টদের জন্য পুরোপুরি
রেড ফ্ল্যাগ- জিনিসটা তখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম । IOP lowering drop দিলাম চোখে
আর সাথে প্যারাসিটামল খেয়ে নিলাম । পুরো ট্যুরে
এই একটা দিনেই আমার চরম দুর্বিষহ লাগছিল। এমনিতে আমার ফিজিক্যাল ফিটনেস ভালো হলেও এই
চোখের আর মাথার ব্যথায় একসময় give up করার চিন্তা মাথায় কাজ করছিল।
এসব ভাবতে ভাবতে
দেখি হাতের পাশে রংধনু দেখা যাচ্ছে, মানে একদম স্বপ্নের থেকেও বেশি সুন্দর একটি দৃশ্য।
রংধনুর একদম উপরিভাগের পাশে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। ক্রমাগত আমাদের ছবি ভিডিও তোলার ফ্ল্যাশের শব্দে চারপাশ আলোড়িত হয়ে উঠল।
![]() |
| হাই ক্যাম্পের বাকি আর কিছুটা পথ! |
চারপাশে অনেকগুলো
ঘোড়া চড়ে বেড়াচ্ছিল । ঘোড়াগুলোর সাথে সম্ভবত কুকুরগুলোর শত্রুতা আছে। প্রাণীর প্রজাতির
মাঝে আন্তঃদ্বন্দ্ব এই প্রথম খেয়াল করলাম । ঘোড়াগুলোকে আদর করলে কুকুরগুলো রাগ করে
দূরে সরে যায়,আবার ঘোড়াগুলো কুকুর গুলোর দিকে তেড়ে আসে। এসব দেখতে দেখতে আমরা পথ
ধরলাম হাইক্যাম্পের উদ্দেশ্যে।
পথ ক্রমাগত
কঠিন তর হতে লাগলো ।সাথে হাইপক্সিয়ার মাত্রা বাড়লো ।এত কিছু ভুলে গিয়ে আমরা এগোতে
থাকলাম। ঘন্টা দুয়েকের মাঝে হাইক্যাম্প ভিউ পয়েন্টে পৌছালাম ।সূর্যাস্তের সময় তখন।
খণ্ড খন্ড মেঘের মাঝে সূর্যের সোনালী আভায় পুরো আকাশ ছেয়ে গেছে । বিস্ময়ের দৃষ্টিতে
উপভোগ করলাম দৃশ্যগুলো ।এখন সব পাহাড়ই মোটামুটি দৃশ্যমান, সূর্যের আলোয় পাহাড়ের
বরফগুলো চকচক করছে ।মন চাইছিল আজীবন দৃশ্যগুলো চোখের সামনে গেঁথে থাকুক। সন্ধ্যা পেরোতেই
আমরা হাই ক্যাম্পের হোটেলে উঠে পড়ি ।হোটেল মালিকের স্বভাব মোটেও ভালো লাগল না ।ওয়াইফাই
এর পাসওয়ার্ড দিতেই গড়ি মসি করছিল। আম্মুকে কল দিব এ কথা বলার পরে শেষমেষ দিল। হোটেলে
লবিতে চিমনির পাশে একজন পাকিস্তানি মত দেখতে ভদ্রলোক বসে ছিল। ভারত পাকিস্তান দুই দেশেরই
রক্ত উনার মাঝে মিশে আছে। গল্প গুজব করতে বেশ পছন্দ করেন। আমরা পুরো বিধ্বস্ত তারপরেও
উনার গল্প শুনিয়ে গেলেন, আমরাও শুনলাম।
![]() |
| হাই ক্যাম্প ভিউপয়েন্টস এ সূর্যাস্ত |
রাতে ভেজ সুপ
অর্ডার করলাম খাওয়ার জন্য। অর্ডার আসতে দেরি হবে দেখে ওয়াশরুমে গেলাম । অস্বাভাবিক
ঠান্ডা পানি । হাত একদমই জমে যাচ্ছিল ।লোকেশনে তাপমাত্রা দেখাচ্ছিলো এক থেকে দুই ডিগ্রী
সেলসিয়াসের মতো । যাইহোক ফ্রেশ হয়ে চিমনির পাশে স্যুপ খেতে আসি। প্রচন্ড রকমের বিস্বাদ,
দুই চুমুক দিয়ে আর এক ফোঁটাও খেতে পারলাম না ।আমার পাশে নাভিদও স্যুপ অর্ডার করেছিল।
টমেটো সস গ্রিন সস সহ যত রকমের সস আছে সব মিশিয়েও খাওয়ার মতন অবস্থায় আনতে পারল না।
আমার এদিকে চোখ মাথাব্যথায় অস্বাভাবিক খারাপ অবস্থা । Nausea ও শুরু হয়েছে । হিমাঙ্কের
কাছাকাছি তাপমাত্রায় গায়ে থার্মাল ইনার উইন্ড ব্রেকার জড়িয়ে কম্বল লেপ মুড়িয়ে
ঘুমিয়ে পড়ি । ঘুমের মাঝেও কয়েকবার স্বপ্ন দেখেছি এই মাথাব্যথায় আগামীকালকে সব ভেস্তে
যাচ্ছে ।আগামীকালের চূড়ান্ত গন্তব্য মারদি হিমাল বেজ ক্যাম্প ,যেটা আমাদের পুরো ট্রেকিংয়েরই
ফাইনাল ডেস্টিনেশন।








%20(1).jpg)

No comments:
Post a Comment