Friday, June 6, 2025

পঞ্চম দিন (মারদি হিমাল ট্রেক : গন্তব্য বেজ ক্যাম্প)

 ২ জুন ২০২৫

ভোর সাড়ে তিনটায় আমাদের বেজ ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করার কথা। ভোর ৩.১৫ এর দিকে প্রমির গলার আওয়াজ এ ঘুম ভাঙ্গে । সবার জন্য দাঈ দুটো করে সেদ্ধ ডিম  নিয়ে এসেছে । প্রমি দিতে এসে দেখে সবাই ঘুমে । আমার ঘুম বেশ কাঁচা ,সামান্য শব্দ শুনে উঠে পড়েছিলাম ।সাথে আফ্রিদিও হন্তদন্ত হয়ে উঠে খাবারটা নিতে যায়,যদিও প্রমি দরজার হাতলে খাবার রেখে দিয়ে আবারো রুমে চলে যায় ।

ভোর ৪ টার দিকে অপারেশন সার্চলাইট গোয়েন্দা বাহিনী


আমার মাথা ব্যথা এখনো রয়ে গেছে। মাথা চোখের ব্যথায় তখনও বেশ বাজে অবস্থা ।তাপমাত্রা মনে হচ্ছিল হিমাঙ্কে নেমে গেছে। আমারও টিথ চ্যাটারিং শুরু হয়েছিল ,থামাতেই পারছিলাম না । কপালে হেডলাইট বেঁধে হাতে গ্লাভস জড়িয়ে যাত্রা শুরু করলাম বেজ ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে । পাঁচ মিনিটের মাথায় সবার মনে পড়ল ডিমের প্যাকেট নিয়ে আসা হয়নি । আমি দৌড়ে প্যাকেট  আনতে গেলাম । পরে দেখি রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি । অন্ধকারে জোরে চিৎকার করতে লাগলাম “ আই হ্যাভ লস্ট মাই ওয়ে, ইজ এনি বডি হেয়ার ?” আমার চিৎকার শুনে দাঈ পেছনে ব্যাক করল আমাকে সাহায্য করতে।  আমি চিৎকার করে আফ্রিদি আর তাজওয়ারকে বললাম ডিমের প্যাকেট নিয়ে আসতে। ওরা প্যাকেটটা নিয়ে আসলে আমার ব্যাক প্যাকে নিয়ে নিলাম।



ডিম পর্ব


ইতালিয়ান কাপল দের সাথে বেজ ক্যাম্পের পথে


আমি তারপরে ফাস্ট পেইসে হাঁটা দিয়ে রিহা প্রমি আজমাইন কে ধরতে পারলাম ।নাভিদ অনেকটা সামনে চলে গেছে ততক্ষণে ।কপালে হেডলাইট ,হাতে ট্রেকিং পোল, কাঁধে ব্যাকপ্যাক- একদম পুরোপুরি অ্যাডভেঞ্চারের ফিলিং আসছিল ।পথিমধ্যে একটা খেজুর খেয়ে একটু রেস্ট নিয়ে আবারো হাঁটা শুরু করি। এখন ট্রেকের এলিভেশন অনেক বেশি । সিঁড়ির পরিমাণও অনেক বেড়ে গেছে ,হাইপক্সিয়া আগের থেকে অনেক বেশি পরিমাণে হচ্ছিল। মাথাব্যথা একটু কমেছে হাঁটতে হাঁটতে। আজকে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি শক্তি প্রয়োগ করতে হচ্ছে উপরে ওঠার জন্য ।

বেজ ক্যাম্পের পথে ,পর্ব-২


উঠতে উঠতে মাঝে  চারণভূমি চোখে পড়ল । অনেকগুলো চমড়ি গাই ঘুরে বেড়াচ্ছিল। দাঈ বলল ওদেরকে বিরক্ত না করলে ওরাও কিছু করবে না। আমরা পাশ কাটিয়ে চলে গেলাম। আমরা বলতে এখন আমার সাথে আছে প্রমি আর তাজওয়ার। নাভিদ সামনে আর রিহা আজমাঈন আফ্রিদি পিছনের দিকে। আফ্রিদি আর  তাজওয়ার পানি নিতে ভুলে গেছে ।আমাদের কয়েকজনের থেকে কিছুক্ষণ পরপর এক চুমুক করে খাচ্ছে ।পথিমধ্যে একটা পাথরে বসে আমরা তিনজন সেদ্ধ ডিম খেয়ে নিলাম। ডিম খাওয়া শেষে আবারো সেই ইতালিয়ান কাপলের সাথে দেখা । কমপক্ষে 20 থেকে 30 বার ওদের সাথে আমাদের দেখা হয়েছে , তাই স্মৃতিস্বরূপ তাদের সাথে সেলফি তুললাম।

বেজ ক্যাম্প ভিউপয়েন্টস


সেলফি পর্ব শেষে আবারো হাঁটার শুরু। অলটিমিটারে দেখাচ্ছে ৩৯০০ মিটারের কাছাকাছি এসে গেছি ।শরীর তখন কোনভাবেই চলছে না ।বাতাসের তোড়ে  মনে হচ্ছিল কখনো ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাই কি না । সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে উপরে উঠতে থাকলাম।  খালি সামনের স্টেপে মনস্থির করছি, বেশি উপরে তাকাচ্ছি না । সবশেষে অনেক দূরে কিছু ঘরবাড়ি ,অস্থায়ী হোটেলের মতন দেখা গেল । বুঝতে পারলাম বেজ ক্যাম্প ভিউ পয়েন্টস এর কাছাকাছি এসে পড়েছি । মাত্র তখন ৪-৫টা স্টেপ বাকি। কিন্তু  শরীর যেন অসাড় হয়ে গিয়েছিল। নাভিদ উপর থেকে ডাকছিল “আর মাত্র দুই স্টেপ, উঠে পড়!” আমার শরীর মন কোনটাই চলছে না তখন। হুট করে সজ্ঞানে আসতেই দ্রুত উপরে উঠে বসলাম আর আমার জীবনের এ যাবৎকালের সর্বাধিক চমকপ্রদ মুহূর্তের  দেখা পেলাম ।

বেজ ক্যাম্প, চা, অন্নপূর্না আর আমি


এখন উচ্চতা ৪২০০ মিটার । সামনে বরফাবৃত অবারিত অন্নপূর্ণা পর্বত শ্রেণী। মেঘ - আকাশ - পর্বত সব মিলে কী রকম লাগছিল সেটা এখানে লিখে বোঝানোর মতোন ভাষা নেই।  হিমালয় থেকে ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। মুখের সামনে দিয়ে মেঘ স্পর্শ করে যাচ্ছে। এমন অভূতপূর্ব পরিবেশে পাশের টং দোকান থেকে লাল চা খেলাম। এরকম একটা মুহূর্ত সম্ভবত জীবনে একবারই আসে। হিম শীতল পরিবেশে গরম চা সাথে ঠান্ডা বাতাসের শনশন আওয়াজ- আজীবন মনে গেঁথে থাকার মতোন মুহূর্ত। ঘন্টাখানেক পরে রিহা আজমাইন আর আফ্রিদি বেজ ক্যাম্প ভিউ পয়েন্টে পৌঁছালো ।আমরা অনেকগুলো গ্রুপ ফটো তুললাম, রিলস রিক্রিয়েট করলাম ।ভবিষ্যতে কেউ মারদি হিমাল ট্রেকে গেলে আমাদের এ রিলসগুলাই দেখবে হয়তো !

 

বেজক্যাম্পে অন্নপূর্ণার  সাথে 

তাপমাত্রা তখন হিমাঙ্কের নিচে। কিছু সময়ের জন্য স্নো ফল হলো । আমরা সবাই চিৎকার করে উঠলাম ।যদিও আমি খুব অল্প সময়ের জন্য পেয়েছিলাম তবুও জীবনের এই প্রথম স্নো দেখার মুহূর্ত মোটেও ভুলবার নয়।


বেজ ক্যাম্প ভিউপয়েন্টস


দাঈ প্রাজ্জাল এর সাথে আমরা ৭ জন

পাহাড়ের ওই বুকেতে দাঁড়াই
আকাশের হাতছানিতে সাড়া দিই






আমি আর তাজওয়ার বেলা এগারোটা তে রওনা দিয়ে দেই আবার হাই ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে ।এখন আমাদের রিটার্ন ফেইজ। নামতে কোন সমস্যা হলো না  আমার।  নেপালি কয়েকজন স্টুডেন্ট যারা অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রাজুয়েট, তাদের সাথে কথা বলতে বলতে নিচে নামতে থাকলাম । পরে ওরা অন্য রাস্তা দিয়ে চলে গেলে আমি একাই সাইন ফলো করতে করতে হাই ক্যাম্পে আমাদের হোটেল ম্যাজিক মাউন্টেইন এ চলে আসি এক ঘন্টার মাঝেই ।হোটেলে আমি সবার প্রথমে আসি ,এসে ফোন চার্জ দিতে থাকি । সাথে সাথে ইন্টারনেট  ব্রাউজ করতে করতে কে-৭৯ এর আরভিন আদিত্যের মৃত্যু সংবাদ চোখে পড়ে ।খুব মর্মাহত হয়েছিলাম ওই মুহূর্তটায় ।

যাই হোক দুপুরে এগ ফ্রাইড রাইস দিয়ে লাঞ্চ করলাম । লাঞ্চ শেষ করে খবর পেলাম পোখারায় আন্দোলন চলে, সুইফট টুরিস্ট বাস রাতের বেলা বন্ধ । আমাদের প্ল্যান আচমকা পরিবর্তন করতে হলো । সঞ্জু ভাইয়ের পরামর্শ মতন ঠিক করা হলো আমরা পরদিন পোখারা থেকে বাসের বদলে স্কোরপিও জীপে করে কাঠমান্ডু যাব ।আপাতত আজকের দিনের জন্য গন্তব্য বাদল ডান্ডা ।বাদল ডান্ডায় হিমালায়ান ম্যাজেস্টি তে আজকে আমাদের থাকার কথা।


হাই ক্যাম্প থেকে বাদল ডান্ডায় দেড় ঘন্টার মাঝেই পৌঁছে গেলাম ।নিচে নামার সময় আমাদের কারোরই তেমন সময় লাগছিল না (এমনকি রিহা আজমাইন এর ও না !)। হোটেল হিমালায়ান ম্যাজেস্টি তে রাতের অভিজ্ঞতা সম্ভবত সব হোটেলগুলোর মাঝে সবচেয়ে সেরা অভিজ্ঞতা ছিল। পুল এবং লুডু খেলার ব্যবস্থা ছিল। আমরা সবাই এক্সাইটেড হয়ে খেলা শুরু করলাম আর চিৎকার করতে থাকলাম ।হোটেলে এক সুইস কাপল আমাদের পাশের রুম নিয়ে ছিল। আমাদের বাচ্চা সুলভ আচরণ দেখে ওরা মুচকি মুচকি হাসছিল ।রাতে তারপরে ওদের সাথে কিছুক্ষণ কথা বললাম। আমি রজার ফেদেরারের হিউজ ফ্যান।ছোটবেলা থেকে ফেদেরারের খেলা দেখে আসছি। ওরা শুনে খুবই অবাক হলো।আমি যতটুক ফেদেরারকে নিয়ে জানি ওরাও জানে না।সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালা নিয়ে বললাম। সুইজারল্যান্ড নিয়ে আমার আগ্রহ দেখে ওরা অনেক খুশি হলো। 

হিমালায়ান ম্যাজেস্টি তে ৩৫৫০ মিটার পুল 


৩৫৫০ মিটার লুডো


রাত্রে আমি নেপালের ঐতিহ্যবাহী খাবার তিবেতিয়ান ব্রেডের সাথে জ্যাম ডিনার হিসেবে খেলাম ।সাথে রাত্রে পুল আর লুডো খেলা তো রয়েছেই ।লুডো খেলায় যদিও হেরেছি তবুও 3550 মিটার উচ্চতায় নাটকীয় মুহূর্তে ভরা লুডো খেলার দানগুলোর কথা মনে থাকবে।এ হোটেলের মোটামুটি সবকিছু ভালো হলেও ওয়াশরুম নিয়ে কিঞ্চিৎ অসন্তুষ্টি ছিল ।আর রুমের মাঝের দেয়ালগুলো সাউন্ড প্রোটেকটিভ না- সেজন্য রাতে ঘুমানোর আগে একটু জোরেশোরে গল্পও করা গেল না। কিন্তু সবশেষে আজ রাত্রেই সবচেয়ে বেশি আরামদায়ক ঘুম ঘুমানো গেল। হাই অল্টিটিউট থেকে লো অল্টিটিউড এ আসলে যে সাউন্ড স্লিপ হয় এ কথার যথার্থতা বুঝতে পারলাম।




No comments:

Post a Comment

সপ্তম দিন ( গন্তব্য বাংলাদেশ )

  ০৪ জুন ২০২৫ সকাল ছয়টার দিকে ঘুম থেকে উঠে যাই। আমি, প্রমি আর নাভিদ বেরিয়ে পড়ি থামেল কাঠমান্ডুর রাস্তায়। সকালে তেমন কোন খাবারের দোকান ...