৩ জুন ২০২৫
আমি ভোর ছয়টার
মাঝে উঠে গেলাম। ফোন চার্জ দিয়ে ব্রেকফাস্টের জন্য রেডি হলাম। সবাই আজকে বেশ ফুরফুরে
মেজাজে আছে ।ভালো ঘুম হয়েছে সবার।আফ্রিদি তার ‘মাচুপিচু’র ছবি নিয়ে আবার রিলস বানাতে
ব্যতিব্যস্ত। ব্রেকফাস্ট শেষে সবাই যার যার ব্যাগ গোছাল। ব্যাগ গুছিয়ে আমরা
রওনা হলাম লো ক্যাম্প এর উদ্দেশ্যে ।
![]() |
| অন্নপূর্ণার শেষ দর্শন |
উপরে উঠার সময়
লো ক্যাম্পে মাইশা রয়ে গেছিল। আর উপরে উঠেনি ,রয়ে গেছে সেখানে। লো ক্যাম্পে পৌঁছাতে
ঘন্টা দু-এক লাগলো ।লোক্যাম্পে যাওয়ার মুহূর্তে শেষবারের মতোন অন্নপূর্ণার ভিউ দেখতে
পেলাম l লো ক্যাম্পে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে আমরা
আবার রওনা দিলাম সিধিং ভিলেজ এর উদ্দেশ্যে
।
| লো ক্যাম্পে ফেরার পথে |
লোক্যাম্প থেকে
সিধিং ভিলেজ এর দূরত্ব তিন ঘন্টার মতোন। অনেক বেশি সিঁড়ি নির্ভর ট্রেক এটা ।এখন বুঝতে
পারছি কেন মানুষ উপরে ওঠার সময় সিধিং ভিলেজ হয়ে না উঠে ফরেস্ট ক্যাম্প দিয়ে উঠে।
ঢাল দিয়ে ওঠা ঢের সহজ সিঁড়ির থেকে। লোক্যাম্প থেকে সিধিং ভিলেজের রাস্তা জুড়েই
শুধু বড় বড় সিঁড়ি। সিঁড়ি যেন শেষই হয় না ।ঘন্টা দুয়েক পরে একটা রেস্ট স্পটে থামলাম।
ওখানে এক ব্রিটিশ কাপল বিশ্রাম নিচ্ছিল, সাথে মোটামুটি বয়স্ক ভদ্রলোক বসে আছে ।আমার
পাশে এসে বসতেই আমি গ্রিটিংস দিয়ে ক্যাজুয়াল কথাবার্তা বলতে লাগলাম। ভদ্রলোক নেপালের
ব্রিটিশ হাই কমিশনে কর্মরত। আমাকে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। কথা
বলতে বলতে সেই দুইজন পোর্টার আমাদের জন্য বড় পাত্রে করে খুরপানি ফল নিয়ে আসলো ।উল্লেখ্য
, পুরো ট্যুর জুড়েই আমাদের সাথে এই দুইজন পোর্টার তিনটে ব্যাগ বহন করে নিয়ে আসছে।
নেপালের বেশ জনপ্রিয় ফল খুরপানি। তবে শহরে নাকি খুব বেশি পাওয়া যায় না। খুরপানি
বা অ্যাপ্রিকটের চামড়াটা হালকা টক, তবে ভেতরের অংশ বেশ মিষ্টি। উপর থেকে নিচে আসার
সময় আমরা যে পরিমাণ শ্রান্ত পরিশ্রান্ত ছিলাম একটা খুরপানি খেয়ে মনে হচ্ছিল যেন স্বর্গীয়
ফল খাচ্ছি। ফল পানি খেয়ে আমরা রওনা হলাম আবারও সিধিং ভিলেজের উদ্দেশ্যে ।
![]() |
| খুরপানি ফল |
| ট্রেকিং এর রেস্ট স্পটে বসে ডাইরি লেখছিলাম। Candid capture by Azmine |
সিধিং ভিলেজ
এখান থেকে আরও এক দেড় ঘন্টার রাস্তা ।রাস্তায় পাথর ছড়ানো ,পায়ে বেশ বাজেভাবে লাগছিল
।অনেক দূরে বেশ কতগুলো ট্যাক্সি দাঁড়ানো দেখলাম। মুহূর্তের মাঝে পায়ের গতি বেড়ে গেল ।শরীরকে অনেকটা
অভিকর্ষের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিচে নামতে লাগলাম ।দূর থেকে দেখতে পেলাম দাঈ ইশারা করছে সবুজ টেমপ্লেটওয়ালা জীপে উঠে বসতে। ধীরে ধীরে সবাই পৌঁছালো। রিহা পৌঁছানোর ঠিক দুই
মিনিট আগের রাস্তায় দুইবার ধপাস করে সবার সামনে পড়ে গিয়েছিল ।বাকিরা বেশ “সহিহ সালামতে”
ই গাড়িতে উঠে বসলো । সিধিং ভিলেজ থেকে স্কোরপিওতে করে পোখারার দিকে রওনা হলাম
।দাঈ প্রাজ্জাল ওই সিধিং ভিলেজ স্টেশন থেকে আমাদেরকে বিদায় জানালো ।
![]() |
| ট্রেকিং শেষ! |
অনেকদিন পরে সমতল ভূমিতে এসে নিজেদের এলিয়েন মনে হতে থাকলো ।দুই ঘন্টার মাঝে পোখারায় গৌরীশংকর ব্যাকপ্যাকার্সে পৌঁছলাম। গৌরীশংকর হোস্টেল লকার থেকে লাগেজ বের করে লবিতে আমরা ফ্রেশ হচ্ছিলাম ।সাথে সাথে আবিরের টেক্সট- সৌম্যদা মারা গেছেন ,লাশ কানাডার লেক থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। সারা শরীর বরফের মতন ঠান্ডা হয়ে গেল । নিজেকে আপাতত কোন মতন সামলে রাখলাম ।হোটেলে লাগেজ গুছিয়ে নিয়ে লাঞ্চের জন্য গেলাম আবারো লাযিয রেস্টুরেন্টে ।
![]() |
| Phewa Lake |
আমাদের বাঙালিদের স্বল্প দূরত্বে রিকশায় চড়ার অভ্যাস। নেপালে গিয়ে রিকশা কে খুব বেশি মিস করছিলাম। পোখারায় বলতে গেলে একেবারেই রিকশা নেই।এখানে হেঁটে চলেই মানুষ রাস্তায় পায়চারি করে। শহরটাও বেশ ছোট।পাড়ার রাস্তার মতোন মনে হয়।আর একটু বেশি দূরত্বের জন্য স্কুটি বা বাইক ভাড়া করে৷ কাঠমান্ডুতে কিছু রিকশা আছে হাতেগোনা,তাও ভাড়া অনেক বেশি চায়। যাই হোক, পুরা নেপালে আমার জন্য রিকশা ভ্রমণ অভিজ্ঞতা শূন্যই রয়ে গেছে।
লাযিযে স্পাইসি
চিকেন আর গার্লিক নান অর্ডার করলাম ।হালাল রেস্টুরেন্ট অনেকদিন পর পাওয়ায় সবাই চেটেপুটে
খেল চিকেন আইটেম টা। খাওয়া-দাওয়া শেষে মাইশা বিদায় নিল আমাদের থেকে ।ও আরো তিন
দিন পর বাংলাদেশে ফিরবে আর আমরা বাকি ৭ জন Phewa Lake গেলাম সময় কাটাতে। Phewa Lake তেমন আহামরি মনে হয়নি
,বাংলাদেশের কাপ্তাই লেকের শর্ট ভার্সন। আমরা না গিয়ে নিজেদের মতন সাইডওয়াকে হাঁটাহাঁটি
করতে লাগলাম। তাজওয়ার ,নাভিদ লেকের পাশে বসে ছিল। আমি ,প্রমি ,আফ্রিদি একটু দূরের জোরবা
রেস্টুরেন্টে কফি খেতে গেলাম । বরাবরের মতোই বিস্বাদ কফি। নেপাল থেকে বাংলাদেশ অন্তত
খাবারদাবারের রুচিতে মাইল খানেক এগিয়ে। সবশেষে
আমরা ব্যাক করলাম আমাদের ব্যাক প্যাকার্স হোস্টেলে
।গাইড সঞ্জু ভাই আমাদের জন্য বড় সাইজের স্কোরপিও জীপ নিয়ে এসেছে। উনার সাথে সরাসরি
আমার এই প্রথম দেখা ।উনার সাথে সবাই থাম্ব আপ সেলফি তুলে রওনা দিলাম কাঠমান্ডুর উদ্দেশ্যে।
এবারের মতো এখানেই শেষ দর্শন ছবির মত সুন্দর
শহর পোখারার।
![]() |
| হোটেল জোরবা ক্যাফে |
গাড়ির ড্রাইভার অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে যাচ্ছিল । এমনকি পাহাড়ি বাঁকে একদম লো ব্যাংকিং এও অনেক দ্রুত গতিতে পার হচ্ছিল । পিছনে বসে এই গতি দেখে ভালোই ভয় কাজ করছিল । ঘণ্টা দু এক পরে রাস্তার পাশে হালাল একটা রেস্টুরেন্টে সবাই ডিনার ব্রেক নিলাম ।ডিনারে ব্রেড ডিম মামলেট খেলাম আমি আর আজমাইন ,আর বাকিরা ডাল ভাত খেলো ।সবাই খুবই সন্তুষ্ট খাবার নিয়ে ।তবে খাবার শেষে ব্যানানা লাচ্ছি খেয়ে মুখের স্বাদ নষ্ট করলাম।
আবারও সবাই
গাড়িতে চড়ে বসলাম ।গাড়িতে ড্রাইভার স্পিকারে বেসুরো গান বাজাচ্ছে যাতে উনি না ঘুমিয়ে
যায় ।আমাদের ঘুমাতে সমস্যা হচ্ছে ,তাও সবাই ঘুমাচ্ছি মরার মত ।বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি
হচ্ছে ।ঘুমাতে ঘুমাতে রাত দুইটা নাগাদ আমরা উঠি কাঠমান্ডুর অ্যান্টিক হোস্টেলের ডর্মিটরিতে।
কবুতরের খোপের মতন কিউট ডর্ম। আর শোয়ার পাশেই চার্জিং সকেট আর ফ্যানের সুইচ ।এমন ‘বিলাসবহুল’
থাকার জায়গা পেয়ে সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়ি





No comments:
Post a Comment